দীর্ঘ দুই বছরের অবরুদ্ধ দশা আর ইসরাইলি বাহিনীর নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের পর আবারও সশরীরে ক্লাসে ফিরতে শুরু করেছেন গাজা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। তবে এই ফেরা কোনো স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তন নয়; বরং ধ্বংসস্তূপ, বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড় আর নিদারুণ সংকটের মাঝে এক হার না মানা লড়াইয়ের গল্প।
অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর গাজা সিটির এই বিশ্ববিদ্যালয়টি পুনরায় খোলা হয়েছে। তবে যে চত্বরে একসময় লেকচার হল ছিল, সেখানে এখন প্লাস্টিকের তাঁবু গেড়ে বাস করছে প্রায় ৫০০ বাস্তুচ্যুত পরিবার। জাবালিয়া থেকে আসা আতা সিয়াম বলেন, আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বলে এখানে আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু এই জায়গাটি শিক্ষার জন্য, আশ্রয়কেন্দ্র হওয়ার জন্য নয়।
ক্যাম্পাসের ভবনগুলো এখন নিছক কঙ্কালসার কাঠামো ছাড়া আর কিছুই নয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গাজায় ইসরাইলের এই কর্মকাণ্ডকে ‘স্কলাস্টিকাইড’ বা পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। ইউনেস্কোর মতে, গাজার ৯৫ শতাংশেরও বেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

আল-মিজান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্যমতে, টানা দুই বছর ধরে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত। ১৩৭টি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। নিহত হয়েছে ১২,৮০০ শিক্ষার্থী এবং ৭৬০ জন শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মী।
১৫০ জন শিক্ষাবিদ ও গবেষককে হত্যা করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজার সর্বশেষ কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইসরা ইউনিভার্সিটি’ও ধ্বংস করে দেয় ইসরাইলি বাহিনী।
ভয়াবহ প্রতিকূলতার মাঝেও অধ্যাপকরা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন। বিদ্যুৎহীন ক্যাম্পাসে জেনারেটর ধার করে আনা হয়েছে, আর খোলা দেয়ালগুলো প্লাস্টিকের শিট দিয়ে ঢেকে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর আদেল আওয়াদুল্লাহ জানান, মাত্র চারটি ক্লাসরুম কোনোমতে ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে উন্মুখ।
প্রথম বর্ষের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রী ইউমনা আলবাবা বলেন, আমি যেমন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখেছিলাম, এটি তার ধারে কাছেও নয়। কিন্তু আমরা সব কিছু একদম শূন্য থেকে শুরু করছি। সরাসরি ক্লাসে বসতে পারছি, এটাই আমার বড় আনন্দ।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শিক্ষা অবকাঠামো ধ্বংস করার মাধ্যমে মূলত ফিলিস্তিনি সমাজের ভিত্তিকেই উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তীব্র খাদ্য ও পানির সংকটের মাঝে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দূরশিক্ষণ কার্যক্রমও মুখ থুবড়ে পড়েছে।
তা সত্ত্বেও গাজার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাকে তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝে এই ক্ষুদ্র শুরুই তাদের কাছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একমাত্র পথ।
ইউক্রেনের পর আর কোনো যুদ্ধে জড়াবে না রাশিয়া, তবে...