শনিবার সকালে মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। মঙ্গলবার 'ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রাপ্ত একচেটিয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রবল চাপে ইরানের 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এই সিদ্ধান্তটি এখনও গোপন রাখা হয়েছে এবং আলী খামেনির দাফন শেষ হওয়ার পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এটি কোনো সাধারণ উত্তরাধিকার নয়; বরং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত, যা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। বর্তমানে বিদেশি আক্রমণ এবং নেতৃত্বে শূন্যতার মুখে থাকা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাছে এখন গতি এবং নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

কেন আইআরজিসি মোজতবাকে বেছে নিল?
আইআরজিসির একই সাথে দুটি জিনিস প্রয়োজন ছিল- নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধতা। 'নিয়ন্ত্রণ' মানে হলো কমান্ড চেইন অক্ষুণ্ণ রাখা, শীর্ষ পর্যায়ে বিভক্তি রোধ এবং ক্ষমতার কামড়াকামড়ি বন্ধ করা। এই সংকটে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাই আইআরজিসির প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে 'বৈধতা' এখানে সাধারণ জনগণের সমর্থন নয়, বরং শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তির (কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও নিরাপত্তা সংস্থা) কাছে গ্রহণযোগ্যতা। মোজতবা খামেনি সরাসরি তার বাবার উত্তরাধিকার দাবি করতে পারেন, যা এই কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য।
মোজতবার সাথে আইআরজিসির সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরনো। দীর্ঘ বছর ধরে তিনি তার বাবা এবং গার্ড বাহিনীর নেতৃত্বের মধ্যে প্রধান যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া গত দুই দশক ধরে তিনি কার্যত সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় বা 'বাইত' পরিচালনা করছেন। ইরানে নির্বাচিত সরকার শুধু একটি পোশাকি কাঠামো; আসল ক্ষমতা এই 'বাইত'-এর হাতেই কুক্ষিগত। ফলে কোনো বহিরাগত এসে যেন এই নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে না পারে, তাই এই শক্তিশালী চক্রটি নিজেদের রক্ষার্থেই মোজতবাকে বেছে নিয়েছে।

দ্বিধাবিভক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র: লড়াই না কি আপস?
ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন দুটি ভিন্ন পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছে:
১. প্রতিরোধ ও লড়াই চালিয়ে যাওয়া: এর অর্থ হলো অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছায়া বাহিনীর মাধ্যমে লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
২. পিছু হটে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া: যুদ্ধ থামাতে এবং আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে নিজেদের আঞ্চলিক ও সামরিক শক্তির মূল স্তম্ভগুলো বিসর্জন দেওয়া।
মোজতবা খামেনি এই দুটি পথের যে কোনোটি বেছে নেওয়ার মতো অবস্থানে আছেন। যদি ব্যবস্থাটি কোনো কঠিন চুক্তিতে যেতে চায়, তবে এমন একজনকে প্রয়োজন যাকে কট্টরপন্থীরা মেনে নেবে। আবার যদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তবে আইআরজিসিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মতো নেতৃত্ব প্রয়োজন। এই উত্তরাধিকারের রাজনৈতিক লক্ষ্য এটাই।
এখন মূল প্রশ্ন হলো- ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র কি তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেবে, নাকি তাকেও তাৎক্ষণিক লক্ষ্যবস্তু করবে? যদি তারা সরাসরি মোজতবাকে আক্রমণ করে, তবে এটি স্পষ্ট হয়ে যাবে, এই অভিযানের উদ্দেশ্য এখন আর শুধু 'চাপ সৃষ্টি' নয়, বরং 'শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন'।

রক্ত ও প্রতিশোধের সংকট
আলী খামেনির জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে যে কোনো চুক্তি ছিল অত্যন্ত কঠিন, কারণ ট্রাম্পের হাতে কাসেম সোলেইমানির রক্ত লেগে ছিল। খামেনি বারবার প্রতিশোধ বা 'কিসাস'-এর ডাক দিয়েছিলেন।
তার উত্তরসূরির জন্য এই বোঝা আরও ভারি। ট্রাম্পের হাতে এখন শুধু সোলেইমানি নন, আলী খামেনির রক্তও লেগে আছে। ফলে যেকোনো আপস করা মোজতবার জন্য অনেক বেশি কঠিন হবে। তবে মোজতবার একটি সুবিধা আছে; তিনি নিজেকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারেন যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। ইসলামি রাজনৈতিক তত্ত্বে 'ব্যবস্থা রক্ষা করা সর্বোচ্চ দায়িত্ব'। মোজতবা যুক্তি দিতে পারেন যে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে তিনি আপাতত প্রতিশোধের বিষয়টি স্থগিত রাখছেন।
পিছু হটার বাস্তব অর্থ কী?
মোজতবা যদি লড়াইয়ের বদলে টিকে থাকাকে বেছে নেন, তবে তার মূল্য হবে অনেক চড়া। এর জন্য তাকে ট্রাম্পের দেয়া কঠিন শর্তগুলো মেনে নিতে হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে:
- পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
- ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার ওপর দীর্ঘমেয়াদী সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া।
- ছায়া বাহিনী বা প্রক্সি নেটওয়ার্ক ত্যাগ করা।
- ইসরাইলের সাথে সংঘাতের নীতি পরিহার করা।
মোজতবার জন্য এগুলো মেনে নেওয়া মানে তার বাবার ৩৭ বছরের দীর্ঘ অর্জনকে এক নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দেওয়া।

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
মোজতবা যদি কট্টর অবস্থান বজায় রাখেন, তবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর মুখে নতুন নেতা হিসেবে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় তিনি খুব কমই পাবেন।
আর যদি তিনি আপস করেন, তবে যুদ্ধ হয়তো থামবে কিন্তু তার উত্তরাধিকার হবে অত্যন্ত ভঙ্গুর। তিনি এমন এক রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেবেন যার অর্থনীতি বিপর্যস্ত, প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তঃসারশূন্য এবং জনগণের ক্ষোভ আকাশচুম্বী। যুদ্ধবিরতি হয়তো বোমা পড়া বন্ধ করবে, কিন্তু রাজনৈতিক পচন ঠেকাতে পারবে না।
পরিশেষে, মোজতবা খামেনি তার বাবার সাজানো সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামনে এখন প্রতিটি পথই অত্যন্ত ব্যয়বহুল, এর টিকে থাকা আর নিশ্চিত নয় এবং গত চল্লিশ বছরে এই প্রথম তেহরানের হাতে হাত দেওয়ার মতো 'সময়' আর অবশিষ্ট নেই।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল
