বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সরাসরি সংলাপ। মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ সংঘাত নিরসন এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই ‘মেক অর ব্রেক’ বা চূড়ান্ত ফয়সালার বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসি জানিয়েছে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে। এমনকি এই আলোচনা পরোক্ষ হলেও, এটি পাকিস্তানের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। গত ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং প্রধান ইস্যুগুলোতে দুই পক্ষের অনড় অবস্থান ও চরম অবিশ্বাসের কথা চিন্তা করলে, এই ধরনের সংলাপের আয়োজন করা কিছুদিন আগেও ছিল অকল্পনীয়।
কাতারভিক্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে,যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের প্রতিনিধি দল এখন সরাসরি আলোচনায় লিপ্ত রয়েছে। খবর পাওয়া গেছে, উভয় প্রতিনিধি দল বর্তমানে একই কক্ষে অবস্থান করছেন এবং সেখানে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরাও উপস্থিত রয়েছেন। মূল প্রতিনিধি দলগুলো শুধু আজকের দিনের জন্যই ইসলামাবাদে অবস্থান করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে; তবে আগামী দিনগুলোতে উভয় দেশের নিম্নপর্যায়ের কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
শনিবার এই আলোচনা শুরুর আগে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উভয় দেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আলাদা দুটি বৈঠক করেন। যদি এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত সরাসরি বা সামনাসামনি আলোচনার পথ প্রশস্ত করে, তবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এটি পাকিস্তানের জন্য হবে একটি বাস্তবধর্মী ও ঐতিহাসিক সাফল্য।

শনিবার সকাল থেকেই ইসলামাবাদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছিল বিশ্বের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রথমে ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পরবর্তীতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন মার্কিন দলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেন।
এই আলাদা বৈঠকগুলোতে আলোচনার পরিবেশ তৈরি এবং উভয় পক্ষের প্রাথমিক দাবি-দাওয়াগুলো নিয়ে সমন্বয় করা হয়। শাহবাজ শরিফ উভয় পক্ষকে নমনীয় হওয়ার এবং গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান। পাকিস্তানের এই নিরপেক্ষ ও বলিষ্ঠ মধ্যস্থতাই মূলত দুই পক্ষকে এক টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক শেষে দুই দেশের প্রতিনিধিরা যখন সরাসরি সংলাপে বসেন, তখন তা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং জব্দকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলোই এই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু।
আলোচনা শুরু হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের ‘চরম অবিশ্বাস’ ও সংশয় বিদ্যমান। ইরান যেখানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অবসান এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টি চাইছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক প্রভাবের নিয়ন্ত্রণ এবং নৌ-পথের নিরাপত্তা। তবে এই অবিশ্বাসের পরিবেশেও আলোচনার টেবিলে বসার সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।

ইসলামাবাদের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে কী ফলাফল আসবে, তা নিয়ে পুরো বিশ্ব এখন গভীর উৎকণ্ঠা ও আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দুই বৈরী দেশ যে সংঘাত ছেড়ে সংলাপের পথ বেছে নিয়েছে, তাকে কূটনীতির এক বিশাল জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি আলোচনা সফল হয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন স্বস্তির জোয়ার নিয়ে আসবে।
