মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান এক অভাবনীয় ও জটিল সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে ইরান এই জলপথে যে বিপুল পরিমাণ নৌ-মাইন পেতেছিল, বর্তমানে সেগুলোর সঠিক অবস্থান তারা শনাক্ত করতে পারছে না। ফলে চাইলেও এই মুহূর্তে প্রণালীটি জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ ঘোষণা করতে পারছে না তেহরান।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ইরান তাদের ছোট ছোট নৌকার সাহায্যে হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপন করে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই মাইনগুলো কোনো সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা বা নথিবদ্ধ মানচিত্র ছাড়াই অত্যন্ত বিশৃঙ্খলভাবে স্থাপন করা হয়েছিল।

ফলে জোয়ার-ভাটা এবং স্রোতের কারণে অনেক মাইন তাদের আদি অবস্থান থেকে সরে গিয়ে অন্যত্র ভেসে গেছে। বর্তমানে ইরান এই মাইনগুলোর হদিস না পাওয়ায় সেগুলো অপসারণ করতে পারছে না।
ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সাথে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির যে বৈঠক চলছে, সেখানে এই মাইন সমস্যাটি একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত এই পথটি খুলে দেয়ার জন্য ইরানকে চরমপত্র দিলেও, কারিগরি এই সীমাবদ্ধতার কারণে তেহরান তা কার্যকর করতে পারছে না।
বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা’ বিবেচনা করে ধীরে ধীরে প্রণালীটি উন্মুক্ত করা হবে। মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, এই সীমাবদ্ধতা মূলত নিখোঁজ মাইন অপসারণের অক্ষমতাকেই নির্দেশ করে।

নৌ-মাইন স্থাপন করা যতটা সহজ, তা খুঁজে বের করে নিষ্ক্রিয় করা তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছেও মাইন অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত শক্তিশালী ব্যবস্থা নেই এবং তারা মূলত লিটোরাল কমব্যাট শিপের ওপর নির্ভরশীল। ইরানের অবস্থা আরও সংকীর্ণ।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের কাছে বর্তমানে ২,০০০ থেকে ৬,০০০টি নৌ-মাইন রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ মাইনের উপস্থিতি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যেখানে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) ইতিমধ্যেই জাহাজগুলোকে সতর্ক করে জানিয়েছে, মাইনের সাথে সংঘর্ষ এড়াতে তারা যেন বিকল্প পথ ব্যবহার করে। তবে নির্দিষ্ট একটি পথ দিয়ে টোল প্রদানকারী জাহাজগুলোকে চলাচলের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম বেড়েই চলেছে, যা ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

হরমুজ অবরুদ্ধ করে ইরান শুরুতে যে কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করেছিল, এখন সেই ব্যবস্থাপনাই তাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা সফল হলেও, সমুদ্রের তলদেশে ছড়িয়ে থাকা এই ‘অদৃশ্য শত্রু’ বা মাইনগুলো সরিয়ে পথটি পুরোপুরি নিরাপদ করতে দীর্ঘ সময় এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে। এর আগ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ ধমনীতে স্বাভাবিক গতি ফিরছে না।
তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
