হরমুজ প্রণালী নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এখন আর শুধু কূটনৈতিক টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি যুদ্ধের হুংকারে রূপ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর জলসীমায় কোনো জাহাজকে মাইন বসাতে দেখলেই যেন সরাসরি গুলি করে ধ্বংস করা হয়।
ট্রাম্পের দাবি, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এখন সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে এবং ইরানের সাথে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই পথ ‘পুরোপুরি সিল’ করে রাখা হবে।

হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি ভারত মহাসাগরেও নিজেদের আধিপত্য বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন যুদ্ধ মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, তারা ভারত মহাসাগরে ইরান থেকে তেলবাহী একটি রাষ্ট্রহীন জাহাজকে মাঝসমুদ্রে আটক ও তল্লাশি করেছে।
মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের দাবি, ইরানের 'অবৈধ' নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে এবং তাদের সহায়তা দেওয়া জাহাজগুলোকে রুখতে এই ধরণের বৈশ্বিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। পেন্টাগনের স্পষ্ট বার্তা, নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কোনো দেশ আন্তর্জাতিক জলসীমাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

অন্যদিকে, ব্রিটেন ও ফ্রান্স হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এবং ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথরিন ভাউট্রিন এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, তাঁরা মিত্র দেশগুলোর সাথে মিলে একটি শক্তিশালী পরিকল্পনা তৈরি করছেন। তাঁরা আত্মবিশ্বাসী যে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথটি আবারও সচল করা সম্ভব হবে। তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ায় মিত্র দেশগুলোর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এবং ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথরিন ভাউট্রিন হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। দুই দেশের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, কূটনৈতিক তৎপরতাকে বাস্তবে রূপ দিতে তারা মিত্র দেশগুলোর সাথে কাজ করছে। তাদের বিশ্বাস, মিত্র দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ও সক্রিয় পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুতই এই নৌপথ খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।

ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর ইরান কার্যত হরমুজ নিজেদের কবজায় রেখেছে। গত মঙ্গলবার শেষ হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় তেহরান এখন আরও অনড় অবস্থানে। ইরানের দাবি, আমেরিকা যতক্ষণ না তাদের জাহাজের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিচ্ছে, ততক্ষণ বিশ্ব বাণিজ্যের এই প্রাণভোমরা তারা খুলবে না। এদিকে, মার্কিন সেনাবাহিনী ভারত, মালয়েশিয়া এবং শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি অবস্থান করা অন্তত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারকে বাধা দিয়ে অন্য পথে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্প যদিও শেষ মুহূর্তে নতুন করে হামলা চালানোর হুমকি বাতিল করেছেন, তবে নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাননি। ফলে যুদ্ধের দামামা পুরোপুরি থামেনি। পাকিস্তান এখনো উভয় পক্ষের সাথে আলোচনার জন্য যোগাযোগ বজায় রাখলেও কোনো নতুন দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী এখন বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে একটি মাত্র ভুল পদক্ষেপ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন-আল জাজিরা-রয়টার্স
