পারস্য উপসাগরে এক মাসের ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি পেরিয়ে আবারও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত শুক্রবার ও শনিবার দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় গোলাগুলি ও পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন কূটনৈতিক টেবিলে শর্ত নিয়ে লড়াই করছে, তখন সমুদ্রের রণক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে বারুদের গন্ধ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিমান হামলার পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় আঘাত হেনেছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই বিশ্বের তেলের চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। গত মাসে ওয়াশিংটন ইরানি জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি।

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা 'ফারস' ও 'তাসনিম' নিউজের তথ্যমতে, গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দুটি ইরানি বন্দর অভিমুখী সন্দেহভাজন জাহাজে তারা আকাশপথে হামলা চালিয়ে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে, ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার রাতে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় একজন ক্রু নিহত, ১০ জন আহত এবং ৬ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
সংকট আরও ঘনীভূত করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র একটি ফাঁস হওয়া বিশ্লেষণ। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও ইরান অন্তত আরও চার মাস অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারবে। এই রিপোর্টটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, কারণ এই যুদ্ধ তাঁর ভোটার ও মিত্র দেশগুলোর কাছে ক্রমাগত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই বিশ্লেষণের সত্যতা অস্বীকার করেছেন।

যুদ্ধের আঁচ শুধু হরমুজ প্রণালীতে সীমাবদ্ধ নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, শুক্রবার ইরান থেকে আসা দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই হামলায় তিনজন সামান্য আহত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকার কারণে ইউএই ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো বারবার ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
এদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাথে সাক্ষাতের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্র দেশগুলোর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন ইতালি বা অন্য মিত্ররা হরমুজ প্রণালী পুনরোদ্ধারে ওয়াশিংটনকে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে না। তবে. আন্তর্জাতিক মহলে এই যুদ্ধের স্বপক্ষে তেমন কোনো জোরালো সমর্থন পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র।

কূটনৈতিক অঙ্গনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি প্রস্তাব পেশ করেছেন, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত দেয়া হয়েছে। শুক্রবারই ইরানের পক্ষ থেকে জবাব পাওয়ার কথা থাকলেও তেহরান জানিয়েছে, তারা এখনো প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, যখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধান সামনে আসে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়া সামরিক দুঃসাহসিকতা বেছে নেয়।
অন্যদিকে, বেইজিং সফরের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের ড্রোন কর্মসূচিতে সহায়তার অভিযোগে চীন ও হংকংয়ের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরানের সাথে অবৈধ বাণিজ্যে লিপ্ত যে কোনো বিদেশি কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তারা কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
