বিশ্ব রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক নাটকীয় ও যুগান্তকারী মোড় দেখল বিশ্ববাসী। নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই আকস্মিকভাবে গতকাল বুধবার ফ্রান্সের বিখ্যাত ভার্সাই প্রাসাদে এক ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেশেশকিয়ান। এই চুক্তির আওতায় মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত কমিয়ে আনতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে, যার বিপরীতে ইরানকে দেওয়া হচ্ছে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা মুক্তি সুবিধা।
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নৈশভোজে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়। ট্রাম্পের এক সহকারীর পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, মোমবাতির আলোয় ঘেরা টেবিলে ম্যাক্রোঁর পাশে বসে চুক্তিতে সই করছেন ট্রাম্প। সই শেষে ট্রাম্প সাংবাদিকদের উল্লাসের সাথে বলেন, এইমাত্র সই করলাম। কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। অন্যদিকে তেহরানে বসে ইরানের পক্ষে গম্ভীর মুখে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেশেশকিয়ান, যার ছবি প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা। চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিশ্চিত করেছেন যে এই চুক্তি অবিলম্বে এবং সরাসরি কার্যকর হয়েছে।

তবে এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরাইল কর্তৃক ঘোষিত যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো দিতে পারেনি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য জটিল কূটনৈতিক দ্বিমতগুলো আগামী ৬০ দিনের একটি দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই চুক্তির শর্ত নির্ধারণের আলোচনায় ইসরায়েল কোনো পক্ষ ছিল না। ফলে ইসরাইলি কর্মকর্তারা এই চুক্তি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ ও গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারা অনুযায়ী, উভয় পক্ষ এবং তাদের মিত্ররা অবিলম্বে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য থাকবে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে মনে করছেন, এই শর্তের কারণে ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের সামরিক চাপ বা লিভারেজ হারিয়ে গেল, যা তেল আবিবকে আত্মরক্ষার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি এই চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে তিনি আবারও বোমা ফেলা শুরু করবেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর ইরানও পুরো অঞ্চলজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। একই সাথে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ অবরোধ করেছিল ইরান, যার জবাবে আমেরিকাও ইরানি বন্দরে নৌ-অবরোধ জারি করে। এই চুক্তির ফলে সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইরান অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রও তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতির ওপর চেপে বসা তেল নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে মওকুফ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়াও, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যদি চূড়ান্ত চুক্তি সফল হয়, তবে ইরানকে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহায়তায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল পুনর্গঠন তহবিল দেয়া হবে বলেও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

এর আগে পরিকল্পনা ছিল, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের উপস্থিতিতে এই চুক্তি সই হবে। তবে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট নিজেই হুট করে সই করে দেওয়ায় সেই সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার বুর্গেনস্টকে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রাথমিক আলোচনার জন্য পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর বসার পরিকল্পনা এখনো রয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, শুক্রবারের বৈঠকটি এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নয়। দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা সরাসরি স্বাক্ষর করায় শুক্রবারের বৈঠকটি আপাতত স্থগিত বা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। সাময়িক এই ধোঁয়াশা থাকলেও, ট্রাম্প ও পেশেশকিয়ানের এই স্বাক্ষর মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনার পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন-রয়টার্স-টাইমস অব ইসরাইল
