বাংলাকে বুকে নিয়ে ছবি ও কবিতার শহর প্যারিসে বাঙালিয়ানার উৎসব! ‘বাংলার মাটির উৎসব’ শিরোনামে শহরে দুই দিনের উৎসবে চলচ্চিত্র, সংগীত আর কবিতায় হাজার বছরের বাংলার গৌরবের দেখা মিলেছিলো। ৮ ও ৯ নভেম্বর শহরের ‘লা কেমেলিয়ন’ হলে আয়োজিত উৎসবে একই ছাদের নিচে সম্মিলন ঘটেছিলো বাঙালি ও ফরাসি চলচ্চিত্রকার, সংগীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী, আবৃত্তিকার, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠকের। আয়োজক ছিল যৌথভাবে Terres du Bengale, Association FranceKriti, Multidimension ও Terra Incognita।
মিলিবে মেলাবে’র এই উৎসবে গুরুত্ব পায় ফ্রান্স ও বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধন। চলচ্চিত্র, সংগীত ও কবিতায় ধরা দেয় বাংলার মাটি-জল মেশানো ইতিহাস আর সংস্কৃতিযাত্রা।
উদ্বোধনী দিনে প্রদর্শিত হয় তিনটি প্রামাণ্যচিত্র। ‘কালার অব ফ্রিডম’ শিরোনামে প্রামাণ্যচিত্রে নির্মাতা অজয় রায় প্যারিসে বসবাসকারী চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমদের মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধ জয়ের কথা এবং প্রবাসে শিল্পের জন্য রঙ তুলি দিয়ে সংগ্রামকে ভাষা দিয়েছেন।

প্রদর্শনীর পর নির্মাতা অজয় রায় ও শিল্পী চর্যা শাহাবুদ্দিন অংশ নেন আলোচনায়। এরপর প্রদর্শিত হয় নির্মাতা প্রকাশ রায়ের তথ্যচিত্র ‘বাংলাদেশ: একটি পতাকার জন্ম’। এই ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা জন্মের পেছনের ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন আর্কাইভ ফুটেজ ও নির্মাতার ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে।
এই দিনের শেষ প্রামাণ্যচিত্রটি পরিচালক জয় ব্যানার্জি’র ‘বনবিবি’। যেখানে সুন্দরবনের পরম পরাক্রমশালী রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে রক্ষা পেতে কীভাবে বনের সব ধর্ম ও বর্ণের লোকজন একই বিশ্বাসের চর্চা করে তারই ঐকতান সুর পেয়েছে।
উৎসবে রাত নামে কবিতায়। বাঙালি ও ফরাসি বাচিক শিল্পীদের আবৃত্তিতে শুরু হওয়া সাংস্কৃতিক আয়োজনে শ্রোতারা মুগ্ধ হলেন আবৃত্তিকার জেরেমি কদ্রন, আবু বকর আল আমিন, নিনা কাবানো’র বাংলা ও ফরাসি আবৃত্তিতে। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী শর্মিলা রায়। শিল্পী আরিফ রানা’র সংগীতায়োজনে বর্ষিয়ান শিল্পী শর্মিলা রায়ের পরিবেশনায় ‘আমার সোনার বাংলা’ গানখানি এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে। হল ভর্তি দুই বাংলা ও ফরাসি দর্শকের কোরাসে গানখানি যেন মুছে দেয় সমকালের সীমারেখা। দিনের শেষটা নামে শিল্পী আরিফ রানা’র মুগ্ধতাজাগানিয়া পরিবেশনায়।

উৎসবের দ্বিতীয় দিন প্রদর্শিত হয় পাঁচটি তথ্যচিত্র। এগুলো হলো জর্জ লুনোর বাউল জগতের অন্বেষণ ‘Le chant des fous’, শিল্পী পবন দাসের ওপর নির্মিত লাডলি মুখোপাধ্যায়ের ‘মন পবনের নাও’, আমিরুল আরহামের নির্মাণ ‘The 1971 War in the Eyes of Pakistanis’, দেবলীনা ঘোষের ‘কীর্তন, দ্য হেরিটেজ অব বেঙ্গল’ এবং শিল্পী সালভাদর দালিকে উৎসর্গ করা অরুণ হালদারের ভিজ্যুয়াল ট্রিবিউট ‘Rêve d’un instant’। প্রতিটি প্রদর্শনীর পর দর্শকরা অংশ নেন আলোচনা পর্বে, যেখানে নির্মাতারা তুলে ধরেন তাঁদের ভাবনা ও অভিজ্ঞতা।
শেষ দিনের সন্ধ্যাও নামে কবিতায়। বাংলা ও ফরাসি অনুবাদে এই পর্বে আবৃত্তি করেন বাচিক শিল্পী অর্পিতা রায়। কবিতায় মুগ্ধতা না কাটতেই পঞ্চ কবির গান নিয়ে মঞ্চে আসেন শিল্পী মৌসুমী চক্রবর্তী। তাকে তবলায় সহযোগিতা করেন অনুভব চ্যাটার্জি। সুরের মায়াজালে ভক্তিরস ছড়িয়ে এরপর মঞ্চে আসেন কলকাতার শিল্পী দেবলীনা ঘোষ। এই কীর্তন শিল্পী’র ভিন্নমাত্রার পরিবেশনায় স্নাত হয়েছেন দর্শক।
শেষ পরিবেশনায় মঞ্চে ‘আলো’ হয়ে আসেন শিল্পী পবন দাস বাউল। তার পরিবেশনায় এক লহমায় ধরা দিল বাংলার মাটি আর জলের সুধা। যে সুধার অন্বেষণে হাজার মাইল দূরে প্যারিসের বুকে বাঙালিয়ানার ঝাঁপি খুলেছিল আয়োজকরা। প্রাণে বাঙালিয়ানা ধরে রেখে বিশ্বমানব হবার এই সাধনা অটুট থাকবে, প্রত্যাশা আয়োজকদের।
