দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংক খাতের প্রকৃত ঝুঁকি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে, আর এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হবে না।
গত দেড় দশকে আগের সরকারের আমলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাস্তব চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। জুনে খেলাপির পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার কোটির কিছু বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে দেশে মোট বিতরণকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অনাদায়ি বা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শুধু এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকার বেশি।
খেলাপি বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী একাত্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের গণনার নীতিমালা পরিবর্তন করায় খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। এছাড়া সরকার পরিবর্তনের কারণে অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। যাদের প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি হয়েছে। আমরা খেলাপি কমানোর জন্য ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ব্যবস্থাগ্রহণ করেছি। আশা করছি আগামী ডিসেম্বর থেকে সেটার প্রভাব দেখা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে কঠোর নজরদারি শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিন কাগজে ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো বহু ঋণ এখন মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে আগের সরকারের সময় বিতরণ করা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগুলোর প্রকৃত অবস্থা সামনে আসছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এখনও সবচেয়ে বেশি খেলাপির বোঝা বহন করছে— যেখানে ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশই অনাদায়ী।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে নামে–বেনামে যে অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে, নিয়মনীতি সঠিক পরিপালনের কারণে এখন তা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন প্রান্তিকে শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৫ কোটি, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। সে হিসেবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংক খাত বিশ্লেষক আরফান আলী একাত্তরকে বলেন, আগের সরকার ব্যাংকগুলোর খেলাপি কম দেখাতে খারাপ ঋণগুলোর তথ্য গোপনে উৎসাহিত করেছিলো। যে কারণে খেলাপি কম দেখা যেতো। কিন্তু নতুন সরকার খেলাপি প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করে দিচ্ছে। এজন্য খেলাপি বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি কমাতে বিভিন্ন ধরনের নীতিসহায়তা দিয়েছে। এটার কারণে খেলাপি হয়ত কিছুটা কমবে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান গড়ার যেই নীতি, এই নীতি পরিবর্তন না করলে এই সমস্যা থেকে বের হওয়া যাবে না। অর্থাৎ স্বল্প সময়ের জন্য আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদি ঋণ দেওয়ার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এজন্য ব্যবসায়ীদেরও উদ্যোগী হতে হবে। সেক্ষেত্রে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার বিকল্প নেই বলেও জানান এই বিশ্লেষক।
এদিকে, আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ এবং সরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশে নামাতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এ লক্ষ্য অর্জন বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০০৯ সালে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এরপর থেকে খেলাপির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, আগের সরকারের সময় ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাট হয়েছে এবং এর একটি বড়ো অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যান সেই অভিযোগের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
৬৪ জেলায় নতুন এসপিদের পদায়নের প্রজ্ঞাপন
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বাংলাদেশের ঢাকা