মার্জারের কারণে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ইসলামী ধারার পাঁচ ব্যাংকের বেশিরভাগ সূচক। আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, এলসি খোলা, রপ্তানি বিল সংগ্রহ, রেমিট্যান্স আহরণসহ সব সূচক উল্টোমুখি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে রপ্তানি আয় গ্রহণে ইসলামী ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক সময়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির সম্মুখীন হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় ছিল ৭৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এক বছর পর, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তা কমে দাঁড়ায় ৭৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ৩.১০ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু ইসলামী ব্যাংক, তারল্য সংকট ও অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালে আগস্ট মাসে এলসি খোলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। যেখানে নতুন এলসি খোলার ক্ষেত্রে ১০০% ক্যাশ মার্জিন বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে, ব্যাংকগুলোর অবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে, ফলে ব্যাংকগুলো এখন স্বাভাবিকভাবে এলসি খুলতে পারছে, কিন্তু অন্যান্য ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে চলতে হচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এখনও কাটেনি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান একাত্তরকে জানান, পাঁচ ব্যাংক মার্জ করে এখন যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। তারা ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। আমানতকারীদের টাকা ফেরত, ঋণ আদায়, এলসি খোলা, রপ্তানি বিল সংগ্রহসহ সব কাজই এখন নতুন পরিচালন পর্ষদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। তারা খুব শীঘ্রই কাজগুলো সচল করবে বলে আশা এই ব্যাংকারের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও রপ্তানি আয় সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের তুলনায় ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর রপ্তানি আয় প্রায় ১১.২৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যদিও সামগ্রিকভাবে আলোচ্য সময়কালে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড়ো অংশ-প্রায় ৭৮.০৯ শতাংশ-প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই গ্রহণ করা হয়েছে।
দেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানতে ধীরগতি থাকলেও প্রচলিত ধারার ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম দ্রুত বাড়ছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর মোট ইসলামী ব্যাংকিং আমানত ৪১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত যেখানে বেড়েছে ৪ শতাংশের কম। একইভাবে সার্বিকভাবে ইসলামী ব্যাংকগুলোর তুলনায় প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর শরিয়াহভিত্তিক ঋণ বা বিনিয়োগ বেশি হারে বেড়েছে। ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গত অক্টোবরভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত এক্সিম, সোস্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এতে করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের সংখ্যা ১০টি থেকে কমে ছয়টিতে নামছে। আর মোট ব্যাংকের সংখ্যা কমে দাঁড়াচ্ছে ৫৭টিতে। ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক যাত্রা শুরু করছে। এসব ব্যাংকের প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীকে ব্যাংকগুলোর চাঁদায় গড়ে ওঠা আমানত বিমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হবে। এ জন্য এখান থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে।
দেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর শাখা রয়েছে এক হাজার ৬৯৯টি। এর মধ্যে একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শাখা ৭৬১টি। ব্যাংকগুলো একীভূত হলেও কোনো শাখা আপাতত বন্ধ হবে না। তবে একই এলাকায় যেখানে একাধিক শাখা রয়েছে, সেখান থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর হবে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের বাইরে প্রচলিত ধারার ১৭টি ব্যাংকের ৪১টি ইসলামী ব্যাংকিং শাখা এবং ৩৩৪টি উইন্ডো রয়েছে। এর বাইরে প্রচলিত ধারার ১২টি ব্যাংকের ৫৮৫টি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রচলিত ধারার ইসলামী ব্যাংকের আমানত ৪১ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়ে ৬৫ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা হয়েছে। এক বছর আগে তাদের আমানত ছিল ৪৬ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। এ সময়ে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত মাত্র ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে চার লাখ এক হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত অক্টোবরে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আমানত ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে চার লাখ ৬৭ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা হয়েছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে যেখানে ব্যাংক খাতের মোট আমানত ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭০ কোটি টাকা হয়েছে। আর মোট আমানতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অংশ কমে ২২ দশমিক ৫৭ শতাংশে নেমেছে। গত বছরের অক্টোবর শেষে ব্যাংক খাতের মোট ১৮ লাখ ৭৪ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ছিল চার লাখ ৩২ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। মোট আমানতে যা ছিল ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বা ঋণ গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা হয়েছে। এর মধ্যে প্রচলিত ধারার ইসলামী ব্যাংকিং ঋণ ৩৫ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ৫১ হাজার ৩১ কোটি টাকা হয়েছে। মূলত খারাপ অবস্থায় পড়া ব্যাংকের ঋণের বড় অংশই খেলাপি হয়ে পড়ায় কোনো আদায় নেই। যে কারণে সামগ্রিকভাবে এসব ব্যাংকের ঋণ তেমন কমছে না।
খেজুর আমদানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক কমালো সরকার
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল আরো একমাস
প্রতারক চক্রের বিষয়ে সতর্ক করলো এনবিআর