চুরির অভ্যাস ছাড়াতে না পারায় মেয়েকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলেন যুগ্মসচিব বাবা। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির শীর্ষ পদে চাকরি করা বোনও দেন না তার পরিচয়। রাজধানীর বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল থেকে শুরু করে সভা সেমিনার; যেখানেই সুযোগ পান চুরি করে সটকে পড়তেন তিনি।
এভাবে প্রায় সাতশ থেকে আটশ মোবাইল, ল্যাপটপ ও দামী ভ্যানিটি ব্যাগ চুরি করেছেন অভিজাত এলাকা থেকে। সবশেষ ভুয়া চিকিৎসক সেজে রোগীর কাছ হাতিয়ে নিচ্ছিল মোটা অংকের টাকা। এমন অভিযোগের পর গোয়েন্দা জালে ধরা পড়েছে অভিজাত এই নারী চোর। গ্রেপ্তার এ চোরের নাম জুবাইদা সুলতানা (৪৪)।
জুবায়দা সে অবসরপ্রাপ্ত এক যুগ্ম সচিবের মেয়ে। পোশাক-আশাকে সবসময় থাকে অভিজাত্যের ছোঁয়া। এসব পরিচয়কে ছাপিয়ে তিনি এখন একজন নারী চোর। পাঁচ তারকা হোটেল ও রেস্তোরাঁয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে চোখের পলকে ব্যাগ, স্বর্ণালঙ্কার, টাকা-পয়সা চুরি করাই ছিল তার অভ্যাস।

গত ১২ বছর ধরে রাজধানীর অভিজাত পাড়ায় ভুয়া পরিচয়ে হোটেল, ক্লাবে সেমিনার ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে দামি জিনিসপত্র চুরি করতেন তিনি। গত ৩ মার্চ ঢাকা ক্লাবে এক সিমিনারে অংশগ্রহণ করে জুবাইদা চুরি করেন ডা. ফারহানা হকের মোবাইল, ব্যাগ ও গয়না।
ডা. ফারহানা হক গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজী বিভাগের চিকিৎসক। চুরির জিনিসপত্র বিক্রি করে দিলেও তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি নিজের কাছে কাছে দেন জুবাইদা। সেই থেকে ডা. ফারহানা সেজে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যাচ্ছিলেন বিভিন্ন রোগীদের এবং হাতিয়ে নিচ্ছিলেন মোটা অংকের টাকা।
চুরির ঘটনা নিয়ে রমনা মডেল থানায় একটি মামলা হয়। মামলা হওয়ার পর থেকে এ বিষয়ে ছায়াতদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তের এক পর্যায়ে শুক্রবার জুবাইদা সুলতানাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে নারীদের ১৬টি হ্যান্ডব্যাগ, ৪টি মোবাইল, পাঁচটি বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড, অলংকার, বিভিন্ন সুপার শপের কার্ড, চারটি পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়।

পরের দিন শনিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টু রোডে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জুবাইদা সুলতানার চুরির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
তিনি বলেন, জুবাইদা অভিজাত চোর। তার টার্গেট চাকরিজীবী নারী ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়া নারী শিক্ষার্থীরা। তিনি ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, রেডিসন এবং সোনারগাঁওয়ের মতো অভিজাত হোটেলে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিয়ে চুরি করতেন। চোরাই জিনিস ব্যবহার করে যাপন করতেন অভিলাষী জীবন।
গ্রেফতার জুবাইদা বিভিন্ন পাঁচ-তারকা হোটেলে ও রেস্তোরাঁয় বিভিন্ন সংগঠনের সভা-সেমিনার ও কর্মশালায় ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করে অংশগ্রহণ করতেন। সারাদিন গুরু-গম্ভীর আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে চুরি করে সটকে পরতেন এই নারী।

ডিবি প্রধান বলেন, ১২ বছর ধরে জুবাইদা চুরি করে আসছিলেন। নিজেকে রাখতেন পরিমিতভাবে গুছিয়ে। নিবন্ধন করে অংশ নিতেন বড় বড় সভা-সেমিনার ও ওয়ার্কশপে। এসব অনুষ্ঠানে গিয়ে সুকৌশলে চুরি করতেন বিভিন্ন দামি দামি জিনিসপত্র। তার নিয়মিত যাতায়াত ছিলো ঢাকার অভিজাত সব স্থানে।
জুবাইদার বোন দেশের একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির একজন বড় কর্মকর্তা। তার এসব খারাপ অভ্যাসের জন্য তাকে পরিবার থেকে বিতারিত করা হয়েছে। জুবাইদা বিয়ে করেছেন দুটি। তার বর্তমান স্বামীর চতুর্থ স্ত্রী তিনি। তার স্বামী বর্তমানে সৌদি প্রবাসী। বিদেশে থাকলেও জুবাইদার চুরি করা জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার জানান, জুবাইদা কোন কোন হোটেল যান এবং কীভাবে রেজিস্ট্রেশন করতেন তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এছাড়া অভিজাত হোটেলের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তার কোনো সখ্যতা আছে কি না তাও তদন্ত ও যাচাই করা হবে। তাকে কারা সহায়তা করতো তাও খতিয়ে দেখা হবে।
