জুলাই আন্দোলনে নিহত শহীদের কন্যা লামিয়া ধর্ষণ মামলার রায়ে অভিযুক্ত তিন জনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে পর্নগ্রাফি আইনে দুই জনকে আরও তিন বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে পটুয়াখালী জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিলুফার শিরিন এ রায় ঘোষণা করেন।
১০ বছরের জেলসাজার আসামিরা হলেন- সাকিব মুন্সী, সিফাত মুন্সী ও ইমরান। তাদের মধ্যে তিন বছর কারাদণ্ডের আসামিরা হলেন- সাকিব মুন্সী ও সিফাত মুন্সী। প্রত্যেকের বয়স ১৭ হওয়ায় তাদের যশোর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।
আদালত ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, লামিয়ার বাবা জসিম উদ্দিন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ছাত্র আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হন। পরে ২৯ জুলাই মোহাম্মদপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরের দিন পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার রাজগঞ্জ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত জসিম ওই এলাকার বাসিন্দা ও ঢাকায় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক ছিলেন।
এ ঘটনার প্রায় আট মাস পর চলতি বছরের ১৮ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বাবার কবর জিয়ারত শেষে নানাবাড়িতে ফেরার পথে জসিমের কন্যা লামিয়াকে উপজেলার পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের আলগি গ্রামে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়।
ধর্ষণের সময় আসামিরা তার নগ্ন ভিডিও ধারণ করে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চুপ থাকতে বলে।
পরদিন ১৯ মার্চ লামিয়া নিজেই দুমকি থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় একই গ্রামের সাকিব মুন্সী ও সিফাত মুন্সী নামের দুই কিশোরকে।
পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুমকী থানার উপপরিদর্শক (তদন্ত) মো. রফিকুল ইসলাম ১৯ মার্চ প্রথমে সাকিবকে এলাকা থেকে ও ২১ মার্চ সিফাতকে পিরোজপুরের নাজিরপুর থেকে গ্রেপ্তার করে যশোর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠায়।
এদিকে গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার ভাড়া বাসা থেকে লামিয়াকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও পারিবারিক সূত্র জানায়, মানসিক চাপ ও হতাশায় লামিয়া আত্মহত্যা করেন। পরদিন রাতে বাবার কবরের পাশে লামিয়াকে দাফন করা হয়।
পরে পুলিশী তদন্তে ইমরানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে অভিযোগপত্রে তার নাম যুক্ত করে গত ছয় মে ওই তিন জনের বিরুদ্ধেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। ১১ মে ইমরানকে বরিশালের রহমতপুর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এরপর ১৬ জনের সাক্ষ্য শেষে গত ১৯ অক্টোবর দুপুরে মামলার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিচারক রায় ঘোষণার আজকের তারিখ নির্ধারণ করেন।

রায়ের ব্যাপারে চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে লামিয়ার মা , ছোট বোন ও চাচা। তারা শুরু থেকেই ফাঁসির দাবি করে আসছিলেন। তাদের কাছে রায় একটি সান্তনা পুরস্কার বলে মনে করেন।
এদিকে রায়ের ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের পিপি আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, আসামিরা যেহেতু কিশোর তাই শিশু আইনে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে।
পটুয়াখালী জেলা সর্বোচ্চ সরকারি কৌশলে পিপি মজিবুর রহমান টোটন বলেন, শুরু থেকেই এই মামলার ব্যাপারে আমরা সোচ্চার ছিলাম। এ রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। যেহেতু লামিয়ার বাবা জুলাই শহীদ জসীমউদ্দীন বিএনপির কর্মী ছিলো, তাই দলীয় প্রধান তারেক রহমানসহ আমরা সব সময় ভিকটিমের পাশে ছিলাম।
আসামিপক্ষে তিন জন আইনজীবী থাকলেও রায়ের সময় বা পরে তাদের পাওয়া যায়নি বলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
