সুদানের রাজধানী খাতুর্মে এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দেশটির কুখ্যাত আধাসামরিক গোষ্ঠি র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)। এই গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ব্যাপক ধরনের নৃশংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে গেলো তিন জুনের গণহত্যা।
ওই ঘটনায় ১২০ জন লোক নিহত হয় বলে জানা গেছে। এমনকি মৃতদের অনেককে নীল নদে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সুদানের স্বর্ণ ব্যবসা দখল করে রেখেছে এই আরএসএফ। এ কারণে তাদেরকে ‘গোল্ড মার্সেনারি’ হিসাবেও ডাকা হয়।
আরএসএফ এখন সুদানের আসল শাসক শক্তি। তারা একটি নতুন ধরনের শাসন ব্যবস্থা চালু করেছে। জাতিগত মিলিশিয়া এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠির একটি শংকর। বলা যেতে পারে একটি আন্তর্জাতিক ভাড়াটে বাহিনী, যারা একটি রাষ্ট্র দখল করেছে।
আরএসএফ বাহিনীর কমান্ডার হলেন জেনারেল মোহাম্মদ হামদান ‘হেমেতি’ দাগোলো। তিনি এবং তার যোদ্ধারা শুরুর দিকে ব্যাপক সংগ্রাম ও কষ্টের মধ্য দিয়ে আরব মিলিশিয়া বাহিনী হিসাবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে। ‘জানজাবির’ হিসাবে তারা পরিচিতি পায়।

২০১৩ সালে সুদানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ওমর আল-বশিরের এক ডিক্রির মাধ্যমে আরএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে তাদের পাঁচ হাজার মিলিশিয়া সদস্যর অনেক আগেই সশস্ত্র এবং সক্রিয় ছিলো। ২০০৩ সালে দারফুরে কৃষাঙ্গ আফ্রিকানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বশির যাদেরকে ভাড়া করেছিলেন, পরবর্তীতে তারাই আরএসএফ হিসাবে আবির্ভূত হয়।
জানজাবিরদের মূল অংশ ছিলো উত্তর দারফুরের রিজিগাত জাতিগোষ্ঠীর মাহামিদ এবং মাহারিয়া শাখার উট-পালনকারী যাযাবর এবং চাদের সীমান্ত সংলগ্ন মরুভূমির প্রান্ত জুড়ে বিস্তৃত ছিলো। দুই দেশের সীমান্ত রেখা চূড়ান্ত হবার আগ থেকেই জানজাবিরা সক্রিয় ছিলো।
২০০৩-০৫ সালে দারফুর যুদ্ধ এবং গণহত্যার সময় সবচেয়ে কুখ্যাত জানজাবির নেতা ছিলেন মাহামিদের প্রধান মুসা হিলাল। এই বাহিনী নৃশংতার জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠে। সেই সঙ্গে সুদান প্রেসিডেন্ট বশির তাদের সেই নৃশংতাকে ব্যবহার করার জন্য বর্ডার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট নামে একটি আধাসামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন।
এই বাহিনীর একটি ব্রিগেড দক্ষিণ দারফুরে সক্রিয় ছিলো। এই ব্রিগড তরুণ যোদ্ধা মোহাম্মদ দাগোলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলো, যিনি তার শিশুর চেহারার কারণে ‘হেমেতি’ নামে পরিচিত ছিলেন। ওই অঞ্চলে হেমেতি অর্থ ছোট মোহাম্মদ। যা মায়েদের প্রিয় শব্দ।
স্কুল থেকে ঝরে পরা এই মোহাম্মদ দাগালোর বড় ক্যানভানে উত্থান ঘটে ২০০৭ সাল, যখন তাদেরকে অর্থ নিতে অস্বীকার করে সুদান সরকার। হেমেতি এবং তার যোদ্ধারা বিদ্রোহ করে ঘোষণা দেয়, খার্তুমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার।
পরে সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করে আবারও খার্তুমে ফেরেন হেমেতি। তার যোদ্ধাদের দেয়া হয় বাহিনীর মর্যাদা। হেমেতি পান ব্রিগেডয়ার জেনারেলের পদ। সেই সঙ্গে বাহিনীর সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা হয় মোটা অংকের বেতন ও ভাতা।
এসব নিয়ে হেমেতির আরএসএফ এর সঙ্গে সুদানের সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ ও মত পার্থক্য দেখা দেয়। দুই বাহিনীর প্রধান ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা প্রেসিডেন্ট বশিরের আস্থাভাজন হবার জন্য এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পরে। যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আকার ধারণ করে।

২০১২ সালে উত্তর দারফুর রাজ্যের জেবেল আমিরে সোনার খনি আবিষ্কৃত হলে সাবেক প্রভু হিলালের সাথে হেমেতির শত্রুতা তীব্র হয়। সেই সময় সুদানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। কারণ দক্ষিণ সুদান ৭৫ ভাগ তেল নিয়ে আলাদা হয়ে যায়।
২০১৭ সালে হিলাল সোনার খনিতে প্রেসিডেন্ট বশিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে, তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন হেমেতি। তার যোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণে হিলালের বাহিনীকে পরাজিত করে এবং সোনার খনির নিয়ন্ত্রণ নেয়, যা এখন হেমেতির কাছেই রয়েছে।
জেবেল আমিরের সোনার খনিগুলোতে খুব অল্প পরিশ্রমেই সোনা মিলতো। বিশ্বের সবচেয়ে অগভীর খনিগুলোর একটি জেবেল আমির। এই খনির কারণে জেনারেল হেমেতি দেশটির অন্যতম ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। মিলিশিয়া থেকে ব্যবসায়ী হিসাবে খ্যাতি পান।
আরও পড়ুন: চুয়াডাঙ্গায় পারদ ছাড়ালো ৪২ ডিগ্রি, মৌসুমের রেকর্ড
২০১৩ সালে আরএসএফ গঠিত হয়েছিল মূলত কুখ্যাত জানজাবির মিলিশিয়ার যোদ্ধাদের নিয়ে, যারা দারফুরে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নৃশংসভাবে লড়াই করেছিল। এই বাহিনীর প্রায় ৪০ হাজার সদস্য ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের হয়ে অংশ নিয়েছিলো।
এছাড়াও আরএসএফ যোদ্ধাদের লিবিয়াতেও পাঠানো হয়েছে। সুদানে বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের অংশ হিসাবে আরএসএফ বাহিনীকে দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা ছিল। তবে জেনারেল দাগোলো ও সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আল-বুরহানের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে সেটি আটকে যায়। যা শেষ পর্যন্ত গড়ায় লড়াইয়ে।
একাত্তর/আরবিএস
