পাকিস্তানের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রীই তাদের পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। তার আগেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে তাদের।
সবশেষ ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান ইমরান খান।
জিয়ো নিউজের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে ১৯৪৭ সাল থেকে যদি প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রী তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারতেন, তবে ইমরান হতেন দেশটির ১৫তম প্রধানমন্ত্রী। অথচ তিনি দেশটির ২২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
ইমরান পাকিস্তানের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যিনি অনাস্থা ভোটে হারার কারণে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।
তার আগে যারা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তারাও বিভিন্ন কারণে মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।
লিয়াকত আলী খান (৪ বছর): পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডিতে আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হন। মৃত্যুর আগে ৪ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
খাজা নাজিমুদ্দিন (২ বছরের কম): লিয়াকত আলী খান নিহত হওয়ার একদিন পর ১৯৫১ সালের ১৭ অক্টোবর দায়িত্ব গ্রহণ করেন খাজা নাজিমুদ্দিন। কিন্তু, ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর দাঙ্গার কারণে নাজিমুদ্দিনকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন তৎকালীন গভর্নর জেনারেল গোলাম মুহাম্মদ। কিন্তু, তিনি সেই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল নাজিমুদ্দিনকে গভর্নর জেনারেল প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেন।
মোহাম্মদ আলী বগুড়া (২ বছর): ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী বগুড়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু, ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট আঞ্চলিক ইস্যুতে দ্বন্দ্ব এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার না থাকায় ভারপ্রাপ্ত গভর্নর-জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা তাকে সরিয়ে দেন।
চৌধুরী মোহাম্মদ আলী (১ বছর): চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট পাকিস্তানের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেন ভারপ্রাপ্ত গভর্নর-জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য পাকিস্তানে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নাম এখনো উচ্চারিত হয়। কিন্তু, ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দলের সদস্যদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে এবং আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্র নিয়ে স্পষ্টবাদী হওয়ার কারণে চাপের মুখে পড়েন তিনি। এরপর তিনি পদত্যাগ করেন।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১ বছর): প্রগতিশীল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। কিন্তু, ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন।
ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দ্রিগার (২ মাস): ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দ্রিগার ১৯৫৭ সালের ১৭ অক্টোবর ৬ষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র ২ মাস।
ফিরোজ খান নুন (১ বছরের কম): ১৯৫৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর ফিরোজ খান নুনকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদে উন্নীত করেন ইস্কান্দার মির্জা। কিন্তু, ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির সময় নুনকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করেন।
নুরুল আমিন (১৩ দিন): ১৩ বছর ধরে সামরিক আইন জারি থাকার পর নুরুল আমিনকে ইয়াহিয়া খানের প্রশাসনের অধীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার ১৩ দিনের মাথায় ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে।
জুলফিকার আলী ভুট্টো (৩ বছর ১১ মাস): ১৯৭৩ সালের ১৪ আগস্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর পর ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় পান তিনি। তবে সামরিক একনায়ক জেনারেল মোহাম্মদ জিয়াউল হক এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করে তাকে কারাগারে পাঠান। ১৯৭৯ সালে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
মোহাম্মদ খান জুনেজো (৩ বছর): সেনাশাসনের অধীন ১৯৮৫ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মোহাম্মদ খান জুনেজো। তবে ১৯৮৮ সালের ২৯ মে জুনেজো সরকারকে বাতিল করা হয়।
বেনজির ভুট্টো (২ বছর): দীর্ঘদিন ধরে জেনারেল জিয়াউল হকের সেনাশাসনের অধীন থাকার পর ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন জুলফিকার আলী ভুট্টোর কন্যা বেনজির ভুট্টো। তিনি ১৯৮৮ সালের ২ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালে অভিশংসন প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যায় তার দল। অবশ্য, শেষ পর্যন্ত তার সরকারও ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে পারেনি। ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট প্রেসিডেন্ট গোলাম ইসহাক খান তাকে দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত করেন।
নওয়াজ শরিফ (৩ বছর): ১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন নওয়াজ শরিফ। তবে ১৯৯৩ সালে গোলাম ইসহাক খান আবারও নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করেন। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজ শরিফ সরকারকে পুনর্বহাল করেন। ১৯৯৩ সালের ১৮ জুলাই নওয়াজ শরিফ ও গোলাম ইসহাক খানকে পদত্যাগে বাধ্য করেন সেনাপ্রধান ওয়াহিদ কাকার।
বেনজির ভুট্টো (দ্বিতীয় মেয়াদে ৩ বছর): ১৯৯৩ সালে আবারও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেনজির ভুট্টো। তবে এ দফায়ও তিনি তার মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ফারুক লেঘারি তার সরকারকে বরখাস্ত করেন।
নওয়াজ শরিফ (দ্বিতীয় মেয়াদে ২ বছর): ১৯৯৭ সালে নওয়াজ শরিফ আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে তিনিও পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর জেনারেল পারভেজ মোশাররফ জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং নওয়াজকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
মীর জাফরুল্লাহ খান জামালি (১৯ মাস): জাফরুল্লাহ খান জামালি স্বৈরশাসক পারভেজ মোশারফের অধীনে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু, মোশাররফ তাকে বরখাস্ত করার আগে তিনি মাত্র ১৯ মাস দায়িত্ব পালন করেন।
চৌধুরী সুজাত (২ মাস): চৌধুরী সুজাত ২০০৪ সালের ৩০ জুন পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হন। শওকত আজিজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন সুজাত।
শওকত আজিজ (৩ বছর): শওকত আজিজ ২০০৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পার্লামেন্টের মেয়াদ শেষ করে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব ত্যাগ করেন।
ইউসুফ রাজা গিলানি (৪ বছর): ইউসুফ রাজা গিলানি ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ১৮তম প্রধানমন্ত্রী হন। তার দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন অর্জন করে। কিন্তু, ২০১২ সালে শীর্ষ আদালত অবমাননার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
রাজা পারভেজ আশরাফ (১ বছরের কম): পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদ শেষ করতে গিলানির কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজা পারভেজ আশরাফ। ২০১২ সালের ২২ জুন থেকে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
নওয়াজ শরিফ (৪ বছরের বেশি সময়): ২০১৩ সালের জুনে তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন নওয়াজ শরিফ। আগের মেয়াদগুলোর তুলনায় এ মেয়াদেই সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। তবে এরপরও পাঁচ বছর পূর্ণ করতে পারেননি। ৪ বছর ৫৩ দিন পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে ছিলেন নওয়াজ। ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই তাকে অভিশংসন করেন সুপ্রিম কোর্ট।
শহীদ খাকান আব্বাসি (১ বছরের কম): নওয়াজ শরিফ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শহীদ খাকান আব্বাসি। ২০১৭ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। নতুন নির্বাচনের জন্য জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়ায় ২০১৮ সালের ৩১ মে তার মেয়াদ শেষ হয়।
ইমরান খান (সাড়ে ৩ বছরের বেশি): ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ইমরান খান। কিন্তু, ইমরান খানও নিজের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ২০২২ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় পরিষদে বিরোধীদের অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা হারান ইমরান খান।
এদিকে নানা অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা শঙ্কা কাটিয়ে পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৃহস্পতিবার। এরইমধ্যে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা ছড়িয়েছে পাকিস্তানের কিছু এলাকায়। বুধবার পৃথক বোমা ও গ্রেনেড হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহতের সংবাদ পাওয়া গেছে।
ইমরান খানকে কারাগারে রেখেই পাকিস্তানে নির্বাচন