গাজার জন্য ২১ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করলো যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:০০ পিএম

গাজায় যুদ্ধের অবসান এবং ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পথ তৈরিতে ২১ দফা প্রস্তাব প্রকাশ্যে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। টাইমস অফ ইসরাইল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই পরিকল্পনায় জিম্মিদের অবিলম্বে মুক্তির পাশাপাশি হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, শান্তিপ্রিয় হামাস সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা এবং ইসরাইলকে গাজা উপত্যকা ছেড়ে দেয়ার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২১ দফা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি হামাস ও ইসরাইল। তবে ওয়াশিংটন দাবি করেছে, উভয়পক্ষ এই পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত আছে। 

এই সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ফাঁকে কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের সাথে আমেরিকা এই পরিকল্পনাটি ভাগাভাগি করেছে। সে সময় ট্রাম্প জানান, শিগগিরই ইসরাইল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তি হবে। আর রোববার ট্রুথ সোশালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সবাই বিশেষ কিছুর জন্য প্রস্তুত। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর হোয়াইট হাউস সফরের আগ মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে বিশেষ এই অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেন। 

গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বসবাসের আহবান জানানোর পরিকল্পনাটি মার্কিন নীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে বলেছিলেন, আমেরিকা গাজার নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং দুই মিলিয়ন গাজাবাসীকে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত করবে। তাছাড়া, ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাটিও ট্রাম্পের নীতি থেকে ভিন্ন, কারণ আমেরিকা কখনও দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে সমর্থন করেনি।

প্রস্তাবটিতে ইসরাইলের জন্যও অনুকূল বিষয় রয়েছে, যেমন হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি, গাজার সামরিকীকরণ এবং জনসংখ্যাকে উগ্রপন্থীমুক্ত করার জন্য একটি প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কখনোই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে প্রচার চালাননি এবং শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বলেন, ৭ অক্টোবরের পর জেরুজালেম থেকে এক মাইল দূরে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র দেয়া মানে ১১ সেপ্টেম্বরের পর নি ইয়র্ক সিটি থেকে এক মাইল দূরে আল-কায়েদাকে রাষ্ট্র দেয়ার মতো। এটা নিছক পাগলামি, আমরা এটা মানবো না। ইসরাইলের গলায় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র চাপিয়ে দিতে দেবে না।

নেতানিয়াহুর এমন মন্তব্যের পরেও গত শুক্রবার ট্রাম্প আশাবাদ দেখাচ্ছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন, একটি চুক্তি হতে পারে। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেছেন, চার দিন ধরে তীব্র আলোচনা চলছে এবং একটি সফলভাবে সম্পন্ন চুক্তি পেতে যতদিন প্রয়োজন ততদিন চলবে।

ট্রাম্প বলেন, এই অঞ্চলের সব দেশ জড়িত, হামাস এই আলোচনা সম্পর্কে খুব সচেতন, এবং নেতানিয়াহুসহ সব স্তরে ইসরাইলকে অবহিত করা হয়েছে। আরব নেতাদের মধ্যে বৈঠকের পর, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, আমাদের একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমরা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য ট্রাম্পের ২১ দফা পরিকল্পনা গাজা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি। 

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি এটি ইসরাইলি উদ্বেগের পাশাপাশি এই অঞ্চলের সকল প্রতিবেশীর উদ্বেগের সমাধান করেছে। এবং আমরা আশাবাদী এবং আমি এমনকি আত্মবিশ্বাসীও বলতে পারি যে, আগামী দিনে আমরা এক ধরণের অগ্রগতি ঘোষণা করতে সক্ষম হবো।

২১ দফা পরিকল্পনার মধ্যে যা রয়েছে

১. গাজাকে একটি উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসমুক্ত অঞ্চলে রূপান্তরিত করা হবে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য কোনও নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করবে না। 
২. গাজা উপত্যকা পুনর্নির্মাণ করা হবে, যার লক্ষ্য হবে এর বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
৩. যদি উভয় পক্ষই এই পরিকল্পনা মেনে নেয়, তাহলে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি হবে, ইসরাইল সামরিক অভিযান স্থগিত করবে এবং গাজা থেকে পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহার শুরু করবে।
৪. হামাস তাদের হাতে জিম্মি জীবিত এবং মৃত ইসরাইলিদেরকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তেল আবিবকে বুঝিয়ে দিবে।
৫. জিম্মিদের ফিরিয়ে দেয়ার পর ইসরাইল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকশ ফিলিস্তিনি বন্দীসহ যুদ্ধ শুরু হবার পর আটক এক হাজারের বেশি গাজাবাসী এবং শত শত ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ ফিরিয়ে দিবে।
৬. জিম্মিদের মুক্তির পর শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হামাস সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা দেয়া হবে এবং যারা চলে যেতে চায় তাদেরকে আগ্রহী দেশগুলোতে নিরাপদে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। 
৭. চুক্তিটি কার্যকর হলে গাজায় মানবিক সহায়তা ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের চুক্তিতে উল্লেখ করা পরিমাণের চেয়ে কম হবে না। প্রতিদিন ৬০০ ত্রাণের ট্রাক প্রবেশের পাশাপাশি অবকাঠামো মেরামত এবং ধ্বংসস্তূপ অপসারণের ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
৮. ত্রাণ বিতরণ কোনও পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই শুধুমাত্র জাতিসংঘ এবং রেড ক্রিসেন্টসহ নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দ্বারা পরিচালিত হবে। 
৯. গাজা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে থাকবে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন, যারা দৈনন্দিন শাসন কাজ পরিচালনার জন্য দায়ী থাকবে। এই সংস্থাটি আরব ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সাথে সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি নতুন আন্তর্জাতিক কমিটি দ্বারা তদারক করা হবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তার সংস্কার এজেন্ডা শেষ না করা পর্যন্ত গাজা পুনরুদ্ধারের জন্য অর্থায়নের দায়িত্ব দেয়া হবে।
১০. গাজা পুনর্নির্মাণের জন্য একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নেয়া হবে। নগর উন্নয়নে আঞ্চলিক দক্ষতার উপর ভিত্তি করে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পরিকল্পনা নেয়া হবে। 
১১. একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হবে, যেখানে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলো স্বল্প শুল্ক এবং উন্নত জীবনমান নিয়ে বসবাসের সুযোগ পাবে। 
১২. কোনও বাসিন্দাকে গাজা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হবে না। যারা চলে যেতে চায় তাদের ফিরে আসার অধিকার থাকবে এবং বাসিন্দাদের সেখানে থাকার জন্য এবং উপত্যকায় একটি উন্নত ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে অবদান রাখার জন্য উৎসাহিত এবং সমর্থন করা হবে।
১৩. গাজার শাসনব্যবস্থা থেকে হামাসকে বাদ দেয়া হবে। টানেলসহ সকল আক্রমণাত্মক সামরিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলা হবে এবং নতুন নেতৃত্ব প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।
১৪. হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ভিক্তিতে আঞ্চলিক পক্ষগুলো গাজার সুরক্ষা নিশ্চয়তা দেবে, যা ইসরাইল ও গাজার জনগণ উভয়কেই সুরক্ষিত রাখবে।
১৫. আরব ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সাথে অংশীদারিত্বে যুক্তরাষ্ট্র গাজায় অবিলম্বে মোতায়েনের জন্য একটি অস্থায়ী বাহিনী গঠন করবে। এই বাহিনী নিরাপত্তা তত্ত্বাবধান করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করার জন্য একটি ফিলিস্তিনি পুলিশ পরিষেবাকে প্রশিক্ষণ দেবে।
১৬. ইসরাইল গাজাকে সংযুক্ত করবে না বা স্থায়ীভাবে দখল করবে না। গাজা উপত্যকায় শান্তি ও শৃংখলা ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলি সেনা বাহিনী সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। 
১৭. যদি হামাস প্রস্তাবটি বিলম্বিত করে বা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সন্ত্রাসী কার্যকলাপমুক্ত এলাকায় এই ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়িত হবে এবং ইসরাইল ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাহিনীর কাছে নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করবে।
১৮. ইসরাইল ভবিষ্যতে কাতারের উপর হামলা থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দেবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘাতে দোহার গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয় এবং দেবে। 
১৯. ইসরাইলি ও গাজার মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং পুনর্গঠনের জন্য আন্তঃধর্মীয় উদ্যোগসহ একটি কাঠামোগত উগ্রবাদ মুক্তকরণ কর্মসূচি চালু করা হবে।
২০. গাজার পুনর্গঠন এগিয়ে গেলে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার কর্মসূচি শেষ হলে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হবে, যা ফিলিস্তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে স্বীকৃত। 
২১. শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কাঠামোর বিষয়ে একমত হতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংলাপকে সহজতর করতে ভূমিকা রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।

আরবিএস
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞ থামেনি। সবশেষ দখলদারদের ড্রোন হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় শিশুসহ অন্তত সাত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ আগ্রাসনের পর থেকে ইসরাইলে ইরান-সংশ্লিষ্ট সাইবার হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির ন্যাশনাল সাইবার ডিরেক্টরেট।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি নিয়ে যখন ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে, ঠিক সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের ‘কসাই’ খ্যাত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানালেন দখলদারদের সাবেক যুদ্ধমন্ত্রী...
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্ভাব্য চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির শর্তাবলীতে নিজের আখের গুছিয়ে নেয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করতে পর্দার আড়ালে এক নতুন চাণক্য নীতি গ্রহণ করেছেন ইসরাইলের...
ভারতের জাতীয় রাজধানী দিল্লিতে নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদ অভিমুখে অগ্রসর হওয়া তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)-র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভকারীদের ওপর দিনভর ব্যাপক...
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন হত্যাসহ হয়রানিমূলক মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদীয়...
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে শরিক নেতাদের উদ্দেশ্য বলেছেন, আমরা অতীতে একসাথে ছিলাম, আছি এবং একসাথেই থাকবো।
স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে বিএনপি সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের এমনটিই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর