বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির কথা উঠলেই সবার মনে ভেসে ওঠে ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস কিংবা ওয়ারেন বাফেটের কথা। এর কারণও আছে এই তিন ব্যক্তিই ঘুরে ফিরে শীর্ষ স্থান দখলে রেখেছেন অনেক দিন থেকে। তবে যদি বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে ধনী নারী কে, তাহলে অনেকেরই হয়তো গুগলের সহায়তা নিতে হবে। ধনী নারীর তালিকায় যাদের নাম থাকে, তাদের বেশিরভাগই থাকেন স্পটলাইটের বাইরে।
ফরাসি প্রসাধনসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লরিয়ালের উত্তরাধিকারী ফ্রাঁসোয়া বেতনক্যুঁ মায়ার্স বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী নারী। কিন্তু বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী ধনী কে, সেই প্রশ্নের জানা নেই অনেকের কাছেই। মডেল ও প্রসাধনী ব্যবসায়ী কাইলি জেনার মাত্র ২১ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ ধনী নারী হয়ে ঝড় তুলেছিলেন।

কিন্তু সেই ঘটনা জয় বছর আগের। এরপর ২০১৪ সালে ১৯ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান ছাত্রী লিভিয়া ভয়ট ফোর্বসের তালিকায় সর্বকনিষ্ঠ বিলিয়নিয়ার হিসেবে স্থান পেয়ে আলোড়ন তোলেন। এছাড়া পপ গায়িকা সেলেনা গোমেজ আর টেলর সুইফটও এই তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।
কিন্তু বর্তমানে মাত্র ২৯ বছর বয়সে বিলিয়নিয়ারের তালিকায় নাম লেখিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান উদ্যোক্তা লুয়ানা লোপেস লারা। বিশ্ব বাজার ব্যবস্থার পূর্বাভাস দেয়া তাঁর প্ল্যাটফর্ম 'কালশি'-এর মূল্যমান সম্প্রতি ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, ফলে তিনি এখন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ এবং স্ব-প্রতিষ্ঠিত নারী বিলিয়নিয়ার।
ধনীদের খোঁজ-খবর রাখার সাময়িকী 'ফোর্বস' পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, লুয়ানা লোপেস লারার এই দ্রুত উত্থান তাঁকে স্কেল এআই এর লুসি গুও-কেও ছাড়িয়ে যেতে সাহায্য করেছে, যিনি সম্প্রতি টেইলর সুইফটের র্যাঙ্কিংকে অতিক্রম করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
প্রারম্ভিক জীবন, ব্যালে এবং শিক্ষা

ব্রাজিলে জন্ম নেয়া লোপেস লারা মস্কোর অভিজাত বলশয় থিয়েটার স্কুলে পেশাদার ব্যালে নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) চেয়েও বেশি কঠিন বলে বর্ণনা করেছেন। লারা বলেন, বলশয় তার জীবন ঘুরিয়ে দেয়া এক অধ্যায় হাই স্কুলের পর তিনি কিছুদিন অস্ট্রিয়ায় পেশাদার নৃত্য পরিবেশনও করেন। একজন গণিত শিক্ষিক মা এবং তড়িৎ প্রকৌশলী বাবার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রেও দারুণ পারদর্শিতা দেখান। তিনি ব্রাজিলের জাতীয় ও আঞ্চলিক বিজ্ঞান ও গণিত অলিম্পিয়াডে একাধিক স্বর্ণ ও ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং এমআইটি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও গণিতে ডিগ্রি নেন। এমআইটিতে থাকতে তিনি কোয়ান্টিটেটিভ ট্রেডিংয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটস, সিটাডেল এবং ফাইভ রিংস ক্যাপিটাল-এর মতো শীর্ষস্থানীয় আর্থিক সংস্থাগুলিতে ইন্টার্নশিপ করেন।
কালশি প্রতিষ্ঠা এবং বিলিয়নিয়ারের মর্যাদা

২০১৮ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে ইন্টার্নশিপ করার সময় লোপেস লারা এবং তাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতা তারেক মনসুর কালশি প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়ে আসেন। তারা লক্ষ করেন যে, এমন কোনো প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে যেখানে মানুষ সরাসরি বাস্তব-দুনিয়ার ঘটনার ফলাফলের ওপর বাণিজ্য করতে পারে।
লারা 'ফোর্বস'-কে জানান, আমরা দেখেছি বেশিরভাগ ট্রেডিং তখনই ঘটে যখন মানুষের ভবিষ্যতের বিষয়ে কোনো ধারণা থাকে এবং তারা সেই ধারণাটিকে বাজারের মাধ্যমে ব্যবহার করার উপায় খুঁজে বের করে।

এই জুটি একটি চুক্তিবদ্ধ বাজার হিসেবে কাজ করার জন্য ফেডারেল অনুমোদনের চেষ্টা চালান। প্রক্রিয়ায় কমোডিটি ফিউচারস ট্রেডিং কমিশনের সাথে আইনি লড়াইয়ে যেতে হয়। অবশেষে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁরা এ সংক্রান্ত মামলায় জয় পান, যা যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী ফল নিয়ে ট্রেডিংয়ের পথ খুলে দেয়।
কালশির মূল্য দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। জুনে ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যমান থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পর্বের পরে এর মূল্য ১১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এই অর্থায়ন পর্বটি উভয় সহ-প্রতিষ্ঠাতাকে বিলিয়নিয়ারের কাতারে ঠেলে দিয়েছে। লোপেস লারা কালশিতে আনুমানিক ১২ শতাংশ অংশীদারিত্বের অধিকারী, যা তাঁকে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক করেছে।
