ইরানের চলমান পরিস্থিতিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সংকটময় পরিস্থিতিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিশ্বস্ত সূত্র থেকে তাকে বলা হয়েছে ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে, তবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর দেশটির সহিংস দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাবনা তিনি উড়িয়ে দেননি। তবে কি ধরনের ব্যবস্থা নেবেন সেটিউ খোলাসা করেননি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, দেশব্যাপী বিক্ষোভের জবাবে ইরানি কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক দমন-পীড়নে আড়াই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বুধবার ট্রাম্প এই মন্তব্য এমন এক সময়ে করলেন যখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশই কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি থেকে তাদের সেনা সংখ্যা কমিয়ে এনেছে। সিবিএস’কে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার ছিল একটি ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’।
গত রাতে ইরানের আকাশসীমা প্রায় পাঁচ ঘণ্টার জন্য সব ধরনের ফ্লাইটের জন্য বন্ধ ছিল। বেশ কিছু বিমান সংস্থা ইরানের ওপর দিয়ে ফ্লাইট না চালিয়ে রুট পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর তেহরানে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে; এখন থেকে এর কার্যক্রম দূরবর্তী স্থান (রিমোটলি) থেকে পরিচালিত হবে। মার্কিন নাগরিকদেরও ইরান ছাড়তে বলেছে ওয়াশিংটন।

এর আগে, বিক্ষোভে অংশ নেয়ায় গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ বছর বয়সী এক যুবকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবরের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেন। এরফান সুলতানি নামের ওই যুবকের বুধবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার কথা ছিল বলে তার পরিবার বিবিসি পার্সিয়ানকে জানিয়েছিল। তবে পরে তারা নরওয়েভিত্তিক কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা ‘হেনগাও’-কে জানায় যে তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, সুলতানিকে বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার করা হলেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার খবর তারা অস্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউস থেকে দেয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রশাসন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছে যে, ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে এবং বর্তমানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি যোগ করেন, অপর পক্ষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র তাঁকে এই তথ্য দিয়েছে এবং তিনি আশা করেন তথ্যটি সঠিক।
সুলতানির পরিবার জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানালেও মামলা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। তেহরানের ঠিক পশ্চিমে ফার্দিস শহর থেকে গত সপ্তাহে এই পোশাক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়।
সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ফাঁসি দেয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না এবং আজ বা আগামীকাল কোনো ফাঁসি হবে না। ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, জুনে আপনারা যে ভুল করেছিলেন তার পুনরাবৃত্তি করবেন না। যদি কোনো ব্যর্থ অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করেন, তবে ফলাফল একই হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুন মাসে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে- এমন আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল।

ইরানের মুদ্রার পতনের প্রতিবাদে গত ডিসেম্বরের শেষে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের বৈধতার সংকটে রূপ নেয়। বর্তমানে জার্মানি, ইতালি এবং পোল্যান্ড তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। জার্মান বিমান সংস্থা লুফথানসা জানিয়েছে, তারা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরান ও ইরাকের আকাশসীমা এড়িয়ে চলবে।
কাতার ভিত্তিক আল-উদেইদ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি, যেখানে প্রায় ১০,০০০ মার্কিন এবং ১০০ জন ব্রিটিশ কর্মী অবস্থান করেন। সেখান থেকে কতজন চলে যাচ্ছেন তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন যে- সাহায্য আসছে।

তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিকল্প কাউকে সমর্থন দেয়ার বিষয়ে তিনি এখনো কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, তিনি দেখতে বেশ অমায়িক মানুষ, তবে তার দেশের মানুষ তাকে গ্রহণ করবে কি না তা আমি জানি না।
গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি করেছে, ফলে সংবাদ যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৪৩৫ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে ১৩ জন শিশু রয়েছে। আরও ৮৮২টি মৃত্যুর ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে।
ইরান ইস্যুতে বৈঠকে বসছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ