আমেরিকা এবং ইসরায়েলের কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলা ও শত শত কোটি ডলারের বোমা হামলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের মাটির নিচের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে পুনরায় সচল করে তুলেছে ইরান। মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী যেসব ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির প্রবেশপথ এবং রাস্তা বোমা মেরে ধসিয়ে দিয়েছিল, ইরান অত্যন্ত সাধারণ মানের বুলডোজার এবং ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করে তা দ্রুত খনন করে ফেলেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সাম্প্রতিক কিছু ছবি বিশ্লেষণ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুদ্ধ কৌশলের চরম সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে, ইরান সম্প্রতি তাদের মিসাইল সক্ষমতার নতুন ভিডিও প্রকাশ করে ওয়াশিংটনকে পরিস্কার বার্তা দিয়েছে যে, এবার ইরানে হামলা চালানো হলে আমেরিকাকে সমুচিত জবাব দেবে তারা। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আরও বেশি পাল্লার ব্যালাস্টিক মিসাইলের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে ইরান।

যদিও সম্প্রতি ইরান- আমেরিকার মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ‘হরমুজ প্রণালী’ সাময়িকভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে, তবে এর খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতে এখনও কয়েক মাসের আলোচনা বাকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো কারণে আবারও যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ইরান আগের মতোই পুরোদমে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাওয়ার মতো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার বলেন, ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও, তাদের কাছে যে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ রয়েছে তা দিয়ে হামলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের শুধু লঞ্চার (ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান) এবং ক্রু বা সেনাদলের প্রয়োজন। আর সেগুলো সচল করতে বাধা দেয়ার মতো পরিস্থিতি বর্তমানে মার্কিন বা ইসরাইলি বাহিনীর নেই।

তিন মাসব্যাপী চলা এই যুদ্ধের শুরুর দিকে মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর প্রবেশপথ লক্ষ্য করে শত শত ভারী বোমাবর্ষণ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল টানেল বা সুড়ঙ্গের মুখগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা দিয়ে দেয়া এবং সংযোগকারী রাস্তাগুলোতে বড় বড় গর্ত বা ক্রেটার তৈরি করা, যাতে ইরান তাদের মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলো বাইরে বের করতে না পারে।
যুদ্ধের সময় প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যেও ইরানি প্রকৌশলীরা এই সুড়ঙ্গগুলো খনন করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, যার কারণে পুরো যুদ্ধজুড়ে কম সংখ্যায় হলেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে পেরেছিল। তবে গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গত সাত সপ্তাহে ইরান এই খনন কাজ রকেট গতিতে বাড়িয়েছে।

সিএনএন-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মোট ৬৯টি সুড়ঙ্গের মুখ বোমা মেরে বন্ধ করে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ৫০টি প্রবেশপথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে ফেলেছে ইরান। শুধু তাই নয়, ইরানের দেজফুল, ইসফাহান এবং খামেন এলাকার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, অন্তত ১০ থেকে ১৮টি বোমার আঘাতের ফলে তৈরি হওয়া বিশাল সব গর্ত সাধারণ মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে এবং অনেক জায়গায় রাস্তাগুলো নতুন করে পিচ ঢালাই করে লঞ্চার চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।
হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি গবেষণা ও নিরাপত্তা নীতি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষক তৈমুর কাদিশেভ বলেন, ইরানিরা গত ২০ বছর ধরে এই ধরণের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তারা খুব ভালো করেই জানে কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছিলেন। গত মার্চ মাসে তাঁর নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই যুদ্ধের ৫টি মূল লক্ষ্যের একটি হিসেবে লিখেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, লঞ্চার এবং এর সাথে সম্পর্কিত সবকিছু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস ও অকেজো করা।
কিন্তু মাটির শত শত মিটার গভীরে পাথরের আস্তরণের নিচে তৈরি ইরানের এই ‘মিসাইল সিটি’ বা ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোর মূল ক্ষেপণাস্ত্র মজুদকে স্পর্শও করতে পারেনি মার্কিন বা ইসরাইলি বাঙ্কার-বাস্টার বোমা। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ইরানের মাটির নিচের এই বাঙ্কারগুলোতে এখনও প্রায় ১,০০০টি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।

যুদ্ধের সময় মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও প্রোপেল্যান্ট (রকেট জ্বালানি) তৈরির কারখানাগুলোও ধ্বংস করে দিয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরান এখন তাদের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চার টেনে বের করার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু তাদের নতুন করে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর প্রতিরক্ষা শিল্প আর অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু স্যাটেলাইটের ছবি এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন বলছে ভিন্ন কথা। মার্কিন গোয়েন্দাদের দেয়া সব সময়সীমা ও অনুমানকে ভুল প্রমাণিত করে ইরান ইতিমধ্যেই ড্রোনের উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলোর পুনর্নির্মাণ কাজ অবিশ্বাস্য গতিতে শেষ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন’কে নিশ্চিত করেছেন, পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ইরানিরা মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের সব হিসাব-নিকাশ ও সময়সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ও পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল অবশ্য এই ব্যর্থতার সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে কেবল পুরোনো বিবৃতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে অভিযান চালানোর সব সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। একদিকে যখন মার্কিন বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টরের মজুদ ফুরিয়ে আসছে, ঠিক তখনই ইরান তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটিগুলো পুনরায় শতভাগ কার্যকর করে তুলছে।
গবেষক তৈমুর কাদিশেভের মতে, এই যুদ্ধ মূলত প্রযুক্তির এক চরম বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে। তিনি বলেন, ইরানের এই সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ করতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে অত্যন্ত পরিশীলিত, আধুনিক এবং কোটি কোটি ডলার মূল্যের সমরাস্ত্র ও নিখুঁত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়েছিল। অথচ ইরান সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছে অত্যন্ত সাধারণ ও সস্তা প্রযুক্তি দিয়ে, যা শুধু কিছু বুলডোজার এবং ডাম্প ট্রাক!
