ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাত যখন এক অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতার মুখে দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চরম হুঙ্কার ছেড়ে জানিয়েছেন, তিনি ইরানি শাসন ব্যবস্থাকে ‘সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস’করতে পূর্ণমাত্রার সামরিক হামলা পুনরায় শুরু করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন, যদিও এ ধরনের চিন্তার এবারই প্রথম নয়।
বৃহস্পতিবার জনপ্রিয় মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস'-কে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমার সামনে এক বিরাট সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। আমি কি ভেতরে ঢুকে তাদের একেবারে নিঃশেষ করে দেব, নাকি দেব না? এটা সত্যিই অনেক বড় সিদ্ধান্ত। আমার ক্ষেত্রে যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে।

ট্রাম্পের এই বিস্ফোরক মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন আগামী মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দেশ, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন।
ইরান যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ কূটনৈতিক আপস নাকি পুরোদমে সামরিক আঘাত- তা নির্ধারণে এই বৈঠকটি চরম অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্প জানান, আমি দেখতে চাই তারা কী ভাবছে এবং তাদের পরিস্থিতি কেমন। আমরা এত দিন তাদের সার্বিক সুরক্ষা দিয়ে এসেছি।
যদি ওয়াশিংটন পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে চায়, তবে রিয়াদ ও অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রদের সরাসরি সমর্থন ও সম্মতি মার্কিন প্রশাসনের জন্য অপরিহার্য।

এর আগে গত আগস্টের শুরুতে মার্কিন বাহিনী যখন বড় ধরনের হামলার কথা ভাবছিল, তখন সৌদি আরব ও কাতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, প্রতিশোধ হিসেবে ইরান তাদের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালাতে পারে। মিত্রদের ওই উদ্বেগের পর ট্রাম্প সাময়িকভাবে পূর্ণমাত্রার হামলা থেকে পিছিয়ে এসে এক সীমিত কিন্তু কঠোর নীতি গ্রহণ করেন।
সেই নীতির অংশ হিসেবে তেহরানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা স্থগিত রেখে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং সমুদ্রপথে কঠোর অবরোধ বজায় রাখা হয়। এই অবরোধ সম্পর্কে ট্রাম্প গর্বের সাথে অ্যাক্সিওস’কে বলেন, অবরোধ শুরুর পর থেকে একটি জাহাজও ইরানে ঢুকতে পারেনি। তারা চেষ্টা করলেই আমরা সেগুলোকে উড়িয়ে দিয়েছি।
এছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনী কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে টহল বাড়ালেও বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত এখনও যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফেরেনি এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়া রয়ে গেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে সিদ্ধান্ত হওয়া মাত্রই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পুনরায় শুরু করা যায়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন এভাবে ঝুলন্ত বা অনিশ্চিত অবস্থায় থাকতে পারে না; খুব দ্রুতই সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পকে নিতে হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নভেম্বরে হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২৭ অক্টোবরের ইসরাইলি নির্বাচন এই পুরো কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে বড় প্রভাব ফেলছে। ওয়াশিংটন বর্তমানে যুদ্ধোত্তর এক আঞ্চলিক পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করছে, যেখানে ইরানকে অবরুদ্ধ রেখে ইসরাইলের সাথে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন, তেহরান এখনও ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। অন্যদিকে, আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে তাঁর বৈঠক হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
