পারস্য উপসাগরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অচলাবস্থা যখন চরমে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত মেটাতে তাঁর চীনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের আগে ট্রাম্পের এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানকে বাগে আনতে তিনি শি জিনপিংয়ের দ্বারস্থ হতে রাজি নন। তাঁর ভাষায়, ইরান ইস্যুতে আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে হোক বা অন্য কোনো উপায়ে, এই লড়াইয়ে জয়ী হবই। তবে ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসের বিপরীতে বাস্তব চিত্রটি বেশ জটিল। এক মাস আগে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতিই হয়নি।

যুদ্ধের সুযোগে ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ইরান ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ও ইরাকের মতো দেশগুলোর সাথে গোপন চুক্তি করে তাদের তেল ও এলএনজি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে।
এর ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একমত হয়েছে যে কোনো দেশই এই পথে চলাচলের জন্য ‘টোল’ বা মাশুল আদায় করতে পারবে না, কিন্তু ইরান এই সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা করছে না।

শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে হবে। অন্যদিকে, ইরান পাল্টা দাবি করেছে যে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে। ট্রাম্প গত সোমবার ইরানের এই দাবিগুলোকে সরাসরি ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর ফলে আলোচনার পথ আপাতত বন্ধ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের চড়া মূল্য দিচ্ছে বিশ্ব ও মার্কিন অর্থনীতি: এই যুদ্ধ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও হু হু করে বাড়ছে পেট্রোল ও নিত্যপণ্যের দাম, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির রেকর্ড গড়েছে। পেন্টাগনের তথ্যমতে, এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত মাসের তুলনায় ৪ বিলিয়ন ডলার বেশি।

পুতিন ও অভ্যন্তরীণ জনরোষের মুখে ট্রাম্প: সামনে মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচন, অথচ এই যুদ্ধ সাধারণ মার্কিন ভোটারদের মধ্যে মোটেও জনপ্রিয় নয়। রয়টার্স/ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, প্রতি তিন জন মার্কিনিদের মধ্যে দুই জনই মনে করেন যে ট্রাম্প এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশও এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দিহান।
তেহরানের হুঁশিয়ারি: এদিকে ইরান তাদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালীর সংজ্ঞায়িত এলাকা আরও বিস্তৃত করেছে এবং শত্রুর যে কোনো আক্রমণ মোকাবিলায় যুদ্ধের মহড়া শুরু করেছে। ইরানের এই অনমনীয় মনোভাব এবং ট্রাম্পের ‘একা লড়াই করার’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদী এবং অনিশ্চিত রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
