মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দুই মেয়াদের শাসনকালে বিশ্বের অন্তত ১৫টি দেশকে হয় সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন, নয়তো হামলার সম্ভাবনা জিইয়ে রেখেছেন, কিংবা সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছেন। সংখ্যার বিচারে এটি বিশ্বের মোট দেশগুলোর মধ্যে প্রতি ১৩টি দেশের মধ্যে একটি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার এই তালিকায় নতুন নাম হিসেবে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকামী দেশ ওমান। ইরানকে সাথে নিয়ে ওমান যদি কৌশলগত হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে অত্যন্ত অনানুষ্ঠানিক ও আকস্মিকভাবেই ওমানকে নিয়ে এই মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ওমানকেও বাকি সবার মতো ভদ্র আচরণ করতে হবে, অন্যথায় আমাদের ওদের উড়িয়ে দিতে হবে। যদিও তাঁর এই মন্তব্যকে কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি ঘোষণা না বলে ক্যাজুয়াল বা খামখেয়ালি মনে হয়েছে, সিএনএন বলছে এটি মূলত ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আগ্রাসী পররাষ্ট্র নীতিরই অংশ, যেখানে সামরিক বলপ্রয়োগের হুমকি একটি নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই হুমকি ও হামলার শিকার হওয়া ১৫টি দেশের প্রায় সব ব্যবস্থাপনাই ঘটেছে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৬ মাসের মধ্যে, যদিও কিছু দেশের ক্ষেত্রে এর সূত্রপাত হয়েছিল প্রথম মেয়াদে। চলতি মেয়াদে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই বিশ্বের ৭টি দেশে সরাসরি সামরিক বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছেন। দেশগুলো হলো ইরান, ইরাক, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও ইয়েমেন।
এর মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ তাঁর প্রথম মেয়াদেও মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। তবে এই তালিকায় ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারকারী সন্দেহে চালানো মার্কিন অভিযানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যে অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০টি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং ১৯০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

সরাসরি হামলা ছাড়াও ট্রাম্প তাঁর বর্তমান মেয়াদে আরও বেশ কয়েকটি দেশকে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন কিংবা হামলার পথ খোলা রেখেছেন। এই তালিকায় রয়েছে ওমান, কানাডা, কলম্বিয়া, কিউবা, পানামা, মেক্সিকো এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। এর আগে তাঁর প্রথম মেয়াদে তিনি মেক্সিকো ছাড়াও উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন।
অবশ্য সিএনএন জানিয়েছে, এই হুমকি ও হামলাগুলোর ধরন সব জায়গায় এক নয়। যেমন ইরাকের ক্ষেত্রে হামলাগুলো দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং সুনির্দিষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল। আবার কিছু দেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্প সরাসরি হুমকি না দিয়ে শুধু এটুকু বলেছেন যে, তিনি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা ‘নাকচ করছেন না’।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্প এ পর্যন্ত যেসব দেশকে নিশানা করেছেন, সেখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রতি ১১ জনের মধ্যে ১ জন মানুষ বসবাস করেন। অর্থাৎ, ট্রাম্পের শাসনকালে বৈশ্বিক জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশকে কোনো না কোনো সময় মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। ভৌগোলিক বিচারে ট্রাম্পের এই আগ্রাসন এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা, এই চার মহাদেশ জুড়েই বিস্তৃত। এমনকি গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি পরোক্ষভাবে ইউরোপের দেশ ডেনমার্ককেও হুমকির মুখে ফেলেছেন।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ট্রাম্পের বেশ কিছু মন্তব্য কেবল সামরিক হুমকিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা মার্কিন ভূখণ্ড সম্প্রসারণ বা ঔপনিবেশিক মানসিকতার দিকে ইঙ্গিত করেছে।
এই ১৫টি দেশের মধ্যে অন্তত ৫টি অঞ্চল বা দেশকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার অথবা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এই তালিকায় রয়েছে কানাডা, কিউবা, ভেনেজুয়েলা, ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ড এবং পানামার কৌশলগত পানামা খাল। ওমানকে দেওয়া ট্রাম্পের সর্বশেষ এই হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে যে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
