এক উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফরে এলেন। তবে গত এক দশকে বিশ্ব পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে একদিকে মার্কিন-ইরান যুদ্ধ এবং অন্যদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সব মিলিয়ে ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই দুই দিনের বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন প্রথমবার বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন, তখনকার চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্প বর্তমানে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন, অন্যদিকে শি জিনপিং চীনের শাসন ক্ষমতার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করেছেন।

বিগত বছরগুলোতে চীনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে তাদের আধিপত্য বেইজিংকে একটি আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ শক্তি এবং রোবোটিক্সের ক্ষেত্রে চীনের অগ্রগতি ওয়াশিংটনের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট
ট্রাম্পের এই সফরের ওপর সবচেয়ে বড় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ। তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এই যুদ্ধের কোনো সমাধান মেলেনি। ট্রাম্প সোমবারই মন্তব্য করেছেন যে, ইরানের সাথে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

চীনের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ মেটায় ইরান। হোরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় চীনের ওপর এর প্রভাব পড়ছে ব্যাপক। ট্রাম্প চাইছেন শি জিনপিং যেন তাঁর প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে হোরমুজ প্রণালী খুলে দিতে এবং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে আসতে রাজি করান। উল্লেখ্য, এই বৈঠকের ঠিক কয়েকদিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং সফর করেছেন, যা ইরান-চীন ঘনিষ্ঠতারই বহিঃপ্রকাশ।
তাইওয়ান ও অস্ত্র সহায়তা ইস্যু
বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে আলোচনার টেবিলে প্রধান ইস্যু হিসেবে থাকবে তাইওয়ান। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ট্রাম্পকে ইরান ইস্যুতে সহযোগিতার বিনিময়ে শি জিনপিং তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রয় কমানোর দাবি জানাতে পারেন। ট্রাম্পও ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন, শি জিনপিং তাঁর সাথে তাইওয়ান ইস্যুতে আলোচনা করতে চাইবেন। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের অবস্থান অনুযায়ী তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করার বিষয়টি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও মানবাধিকার
বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে থাকছেন অ্যাপল-এর সিইও টিম কুক এবং টেসলা ও স্পেসএক্স-এর কর্ণধার ইলন মাস্কের মতো এক ডজন ব্যবসায়ী নেতা। আশা করা হচ্ছে, মহাকাশ গবেষণা, কৃষি এবং জ্বালানি খাতে দুই দেশ বেশ কিছু নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় আসবে।
পাশাপাশি মানবাধিকার ইস্যুতে হংকংয়ের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জিমি লাই এবং যাজক এজরা জিনের কারাবাসের বিষয়টিও ট্রাম্প উত্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন।

শি জিনপিংয়ের কৌশল: রাজনৈতিক ভারসাম্য
বেইজিং এই সফরকে তাদের স্বার্থসিদ্ধির একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। মার্কিন মিড-টার্ম নির্বাচনের আগে ট্রাম্প মার্কিন ভোটারদের কাছে বড় কোনো বাণিজ্যিক সাফল্য দেখাতে চাইবেন—এই সুযোগটিই কাজে লাগাতে চায় চীন। বিনিময়ে তারা হাই-টেক পণ্য রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের জন্য মার্কিন বাজার উন্মুক্ত করার দাবি জানাবে।
ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত রসায়ন এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব সময়ই একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। ট্রাম্প নিজে বেইজিংয়ের আতিথেয়তা ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন পছন্দ করেন।
তবে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের চেয়ে বর্তমান বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যই এই সফরের সাফল্য নির্ধারণ করবে। দুই পরাশক্তির এই সংলাপ শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি নয়, বরং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
