দীর্ঘ যাত্রা শেসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবারে বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন। ইরানের সাথে আলোচনা শুরু করতে এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা প্রশমিত করতে চীনের ওপর মার্কিন চাপ যখন ব্যর্থতার মুখ দেখছে, তখনই এই হাই-ভোল্টেজ সম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছে।
২০১৭ সালের পর এটাই হবে ট্রাম্পের প্রথম চীন সফর। বৃহস্পতি ও শুক্রবার বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির এই দুই নেতার বৈঠকে বাণিজ্য, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি শি জিনপিংয়ের সাথে ইরান নিয়ে ‘দীর্ঘ আলাপ’ করবেন, তবে তাঁর সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বাণিজ্য। আসন্ন এই সম্মেলন এবং এর সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়গুলো নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।

ট্রাম্প-শি সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে যখন বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির দেশ ক্রমবর্ধমান উত্তজেনার সম্মুখীন, তখন বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনটি ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্প প্রায় এক দশকের মধ্যে চীনে পা রাখা প্রথম মার্কিন নেতা। ইরান যুদ্ধের কারণে এই নির্ধারিত বৈঠকটি আগে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
লেইডেন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সালভাদর সান্তিনো রেজিলমে বলেন, বাণিজ্য এখনো রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি বিষয়, বিশেষ করে ট্রাম্পের জন্য; কারণ এটি এমন এক ভাষা যা সাধারণ ভোটাররা সহজে বোঝেন। তবে এই সংঘাতের গভীর কারণ হলো শ্রেষ্ঠত্ব, বৈধতা এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কাঠামো।
তিনি আরও যোগ করেন, দুই দেশই এখন এমন এক সম্পর্কের জালে আবদ্ধ যা একদিকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর অন্যদিকে গভীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা দিয়ে তৈরি। যুক্তরাষ্ট্র যেমন চীনের উৎপাদন ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল, চীনও ঠিক তেমনি মার্কিন ভোক্তা, প্রযুক্তি, মূলধন বাজার এবং ডলার-কেন্দ্রিক বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।

এই সম্মেলনের বড় ইস্যুগুলো কী কী?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও শি জিনপিং ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার নিয়ে এই বৈঠকে বসছেন। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো বাণিজ্য থেকে এমন কিছু অর্জন করা, যা তিনি আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। ওয়াশিংটন চায় চীন যেন আরও বেশি মার্কিন পণ্য (যেমন: বোয়িং বিমান, গরুর মাংস এবং সয়াবিন) কেনে।
অন্যদিকে, বেইজিং চাইবে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে এবং চিপ তৈরির প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করার পদক্ষেপগুলো প্রত্যাহার করাতে। এছাড়া হংকংয়ের কারাবন্দি গণতন্ত্রকামী নেতা জিমি লাইয়ের মুক্তির বিষয়টিও ট্রাম্প উত্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন।
সম্মেলনের প্রধান কয়েকটি ‘ফ্ল্যাশপয়েন্ট’ বা উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু নিচে আলোচনা করা হলো:

প্রযুক্তি বনাম বিরল খনিজ: সেমিকন্ডাক্টর এবং বিরল খনিজ পদার্থ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের লড়াই এখন তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র উন্নত চিপ ও সরঞ্জাম রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে যাতে চীনের সামরিক ও এআই উন্নয়ন মন্থর হয়। জবাবে, বিশ্বের বিরল খনিজ পরিশোধনের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী চীন এই খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ওয়াশিংটন চায় চীন বিরল খনিজ সরবরাহ পুনরায় চালু করুক, কারণ এর অভাবে মার্কিন গাড়ি ও মহাকাশ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী: এই সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হতে যাচ্ছে ইরান যুদ্ধ। চীন ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা (ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশই কেনে চীন)। ওয়াশিংটন চায় বেইজিং যেন তেহরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তাদের আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সহায়তা করে।

স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যান গ্রেজিয়ার বলেন, আমার কোনো সন্দেহ নেই যে ট্রাম্প অন্তত একবার চেষ্টা করবেন যাতে শি জিনপিং ইরানকে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করেন। তবে বিশ্লেষক গ্রেগরি পোলিংয়ের মতে, এই প্রণালী বন্ধ হওয়ায় চীন যতটা না লজ্জিত হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি অপমানিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
তাইওয়ান যখন অস্তিত্ব রক্ষার সংকট: তাইওয়ান ইস্যুটিকে বেইজিং সব সময়ই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। চীন এই স্বশাসিত দ্বীপটিকে নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক থেকে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র বিক্রয় নিয়ে কী বার্তা আসে, সেদিকে গভীর নজর থাকবে তাইপের। চীন চায় মার্কিন অস্ত্র বিক্রয় ও তাইওয়ানের স্বাধীনতার দিকে যে কোনো পদক্ষেপের ওপর সীমাবদ্ধতা আসুক।
শুল্ক ও বাণিজ্য: গত বছর ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করার পর বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র রূপ নেয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার আলোচনায় একটি বাণিজ্য বিরতির মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা কমানো হয়েছিল। এবারের সম্মেলনে শুল্ক কমানো বা স্থায়ী চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সফলতার মাপকাঠি কী হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য সফলতা হবে এমন কিছু চুক্তি যা দেশে গিয়ে তিনি ‘ডিলমেকার’ হিসেবে প্রচার করতে পারবেন। আর, শি জিনপিংয়ের জন্য সফলতা হবে ওয়াশিংটনের কাছে মাথা নত না করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং চীনের বিশ্বশক্তির স্বীকৃতি আদায় করা।
সবশেষে বলা যায়, কোনো বড় বা ব্যাপকভিত্তিক বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা কম থাকলেও, শুল্ক বিরতি বা খনিজ পদার্থ সরবরাহ নিয়ে ছোটখাটো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি কেবল সাময়িকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেবে, গভীরতর সংকটগুলো থেকেই যাবে।
