যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধ অবসানে সাহায্য চাইতে বৃহস্পতিবার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে ট্রাম্পের এই মিশন সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বর্তমান সময়টি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। একদিকে ইরানে চলা যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ তৈরি করেছে, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের আকাশছোঁয়া দাম ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে। এই অবস্থায় ট্রাম্পের উপদেষ্টারা মনে করছেন, ইরানের তেলের বৃহত্তম ক্রেতা চীনই পারে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চীন কেন আমেরিকাকে সাহায্য করবে?

চীনের দ্বিধাবিভক্ত স্বার্থ: চীনের জন্য এই পরিস্থিতিটি অনেকটা দুধারী তলোয়ারের মতো। একদিকে ইরান চীনের অন্যতম কৌশলগত মিত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ঠেকাতে বড় শক্তি। তাছাড়া, আমেরিকার মনোযোগ এখন ইরানের দিকে থাকায় তারা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয় এই পথ দিয়ে, যার বড় অংশই যায় চীনে। তাই যুদ্ধ থামানো চীনের স্বার্থে হলেও, তারা ইরানকে পুরোপুরি কোণঠাসা করতে চায় না।
চাপ দেয়ার সীমিত অস্ত্র: ট্রাম্পের হাতে চীনকে চাপে ফেলার মতো কিছু হাতিয়ার থাকলেও তার ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বড় কোনো চীনা ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ উপাদানের সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। এতে পুনরায় একটি ভয়াবহ বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যা মার্কিন অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে।

ট্রাম্পের অনমনীয় সুর ও বেইজিংয়ের অবস্থান: বৈঠকের আগে ট্রাম্প গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, ইরানকে দমাতে তাঁর চীনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তাঁর মুখপাত্রের মতে, ট্রাম্পের হাতেই সব তুরুপের তাস রয়েছে। কিন্তু বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘একতরফা নিষেধাজ্ঞা’ সমর্থন করে না। চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউর মতে, এখনকার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত যুদ্ধ থামানো, অন্য দেশের ওপর কাদা ছোঁড়া নয়।
কূটনৈতিক চোরাবালি: সাবেক মার্কিন কূটনীতিকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই ‘রাজনৈতিক চোরাবালিতে’ চীন পা দিতে চাইবে না। তারা দেখেছে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে জড়িয়ে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই শি জিনপিং হয়তো ইরানকে আলোচনার কথা বলবেন, কিন্তু তেহরানের ওপর বড় কোনো চাপ তৈরি করবেন না।
সব মিলিয়ে এই সম্মেলন থেকে বড় কোনো ব্রেকথ্রু বা যুগান্তকারী চুক্তির আশা খুবই কম। তেলের উচ্চমূল্য আর মুদ্রাস্ফীতির চাপে যখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন বেইজিং হয়তো বর্তমান অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আরও বড় কোনো ছাড় আদায় করতে চাইবে। ট্রাম্পের জন্য এই বেইজিং সফরটি তাই শুধু একটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়, বরং তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন পরীক্ষা।
