গোটা বিশ্বের চোখ এখন চীনের রাজধানীতে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বহু প্রতীক্ষিত বেইজিং সম্মেলনটি বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বুধবার গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শুরু হওয়া এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই নেতাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন যুগ’ শুরুর বার্তা দিয়েছেন। তবে বন্ধুত্বের আবহের পাশাপাশি তাইওয়ান এবং ইরান ইস্যুতে কড়া সতর্কবার্তা বিনিময়েও পিছিয়ে থাকেনি বিশ্বের এই দুই প্রধান শক্তি।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি অনুযায়ী, শি জিনপিং দু’দেশের সম্পর্ককে একটি ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্কের’ দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। আগামী তিন বছর ও তার পরবর্তী সময়ের জন্য এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ‘সুশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা’। শি জিনপিং স্পষ্ট করেন, মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেদিকে দুই পক্ষকেই সজাগ থাকতে হবে। স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন এবং আইন প্রয়োগের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

তাইওয়ান ইস্যুতে শি জিনপিংয়ের কড়া হুঁশিয়ারি
বৈঠকের সবচেয়ে উত্তপ্ত আলোচনার বিষয় ছিল তাইওয়ান। শি জিনপিং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যুটি চীন-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিষয়। তিনি সতর্ক করেন, এই বিষয়টি সঠিকভাবে পরিচালনা না করলে দু’দেশের মধ্যে সংঘাতময় ও ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি’ তৈরি হতে পারে। বেইজিংয়ের এই মন্তব্যের পরপরই তাইপে থেকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে, এই অঞ্চলে অস্থিরতার মূল কারণ স্বয়ং চীন।

ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকট নিয়ে আলোচনা
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন যেন তারা তাদের মিত্র ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করে। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও দু’নেতার মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে বলে জানিয়েছে চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া।

মরণঘাতী ফেন্টানিল ও মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুই মেয়াদের শাসনামলেই আমেরিকার ফেন্টানিল সংকট একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু। এই মরণঘাতী মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত কেমিক্যালের প্রধান উৎস চীন। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, বেইজিং এই পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এদিনের আলোচনায় ফেন্টানিল পাচার বন্ধে চীনের পক্ষ থেকে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান ট্রাম্প।

মার্কিন সিইও-দের উপস্থিতি ও ভাইরাল মুহূর্ত
ট্রাম্পের এই সফরে সঙ্গী হয়েছেন টেক জায়ান্ট অ্যাপল-এর টিম কুক এবং টেসলা-স্পেসএক্স প্রধান ইলন মাস্কের মতো শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। শি জিনপিং তাঁদের সাথেও আলাদাভাবে দেখা করেছেন। ট্রাম্প রসিকতা করে বলেন, এই সিইও-রা চীনে এসেছেন ‘শ্রদ্ধা জানাতে’ এবং ব্যবসার পরিধি বাড়াতে।
এই সফরের কিছু হালকা মুহূর্ত ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বিশাল সিলিং বা ছাদের কারুকাজ দেখে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র বিস্ময় প্রকাশ এবং নিজের ফোনে ছবি তোলার সময় ইলন মাস্কের ঘুরে ঘুরে ভিডিও করার দৃশ্যটি নেটিজেনদের বেশ বিনোদন জুগিয়েছে।

গ্রেট হল অব দ্য পিপলের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই নেতা ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহাসিক ‘টেম্পল অব হেভেন’ দেখতে যান। সামগ্রিকভাবে, বেইজিংয়ের এই সফর দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বরফ কিছুটা গলাতে সাহায্য করলেও তাইওয়ান ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা কাটানোর চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। ট্রাম্প-শি’র এই নতুন ‘স্থিতিশীল সম্পর্ক’ বিশ্বের জন্য কতটা টেকসই হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
