মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর চীন সফর শেষ করে শুক্রবার ওয়াশিংটনের পথে রওনা হয়েছেন। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট আমেরিকার প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন সফর করলেন।আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়াতে ট্রাম্প এই সফর থেকে বড় কোনো কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সাফল্য আশা করেছিলেন।
তবে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, রাজকীয় ভোজ এবং ‘ঝংনানহাই’ কমপ্লেক্সের সাবেক রাজকীয় উদ্যানে আন্তরিক আলোচনার মধ্য দিয়ে এই সফর শেষ হলেও, বড় কোনো বাণিজ্যিক সাফল্য না আসায় আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারে হতাশা দেখা দিয়েছে। উল্টো তাইওয়ান এবং ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে কড়া বার্তা দিয়েছে বেইজিং।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের চূড়ান্ত বৈঠকের ঠিক আগেই চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি কড়া বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে চীন জানায়, এই যুদ্ধ, যা কখনই হওয়া উচিত ছিল না, তা চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো কারণ নেই। চীন আরও স্পষ্ট করেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা এই যুদ্ধ বন্ধে তারা যে কোনো শান্তি চুক্তিকে সমর্থন করবে।
বৈঠকে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ইস্যুতে দুই দেশের ভাবনা প্রায় একই রকম, তবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। হোয়াইট হাউজের এক সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে জানানো হয়, দুই নেতাই ইরানের কৌশলগত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে সহমত পোষণ করেছেন, যার মধ্য দিয়ে এক সময় বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো।

একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন আমেরিকার কাছ থেকে তেল আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের কাছে ইরান একটি বড় কৌশলগত শক্তি হওয়ায়, চীন কখনোই ইরানকে খুব বেশি চাপ দেবে না।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই সফরে দুই দেশের মধ্যে কৃষিপণ্য বিক্রির চুক্তি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্য পরিচালনার জন্য একটি নতুন কাঠামো তৈরিতে অগ্রগতি হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার মতো বড় কোনো চুক্তি এই সম্মেলন থেকে আসেনি। বিশেষ করে এনভিডিয়া’র উন্নত এআই চিপ চীনের কাছে বিক্রির বিষয়ে কোনো সমাধান মেলেনি, যদিও কোম্পানির প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে এই সফরে যোগ দিয়েছিলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, চীন আমেরিকার কাছ থেকে ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে চীনের এটিই প্রথম মার্কিন যাত্রীবাহী বিমান কেনার চুক্তি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার যেখানে প্রায় ৫০০টি বিমানের অর্ডারের আশা করছিল, সেখানে মাত্র ২০০টির ঘোষণা আসায় বোয়িং-এর শেয়ারের দাম ৪ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে এই সফর পুঁজিবাজারের জন্য আশাব্যঞ্জক হয়নি এবং শুক্রবার চীনের শেয়ার বাজারেও পতন দেখা গেছে।
তাইওয়ান ইস্যুতে কড়া হুঁশিয়ারি: সফরের আবহ আপাতদৃষ্টিতে বন্ধুত্বপূর্ণ ও শিথিল মনে হলেও, তাইওয়ান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। শি জিনপিং সতর্ক করে বলেছেন, চীনের দাবি করা স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান নিয়ে কোনো ধরনের ভুল পদক্ষেপ বা ভুল পরিচালনা বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের রূপ নিতে পারে।
চীন তার উপকূল থেকে মাত্র ৫০ মাইল দূরের এই দ্বীপটিকে নিজেদের অংশ মনে করে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়ে আসছে। অন্যদিকে, মার্কিন আইন অনুযায়ী তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সরঞ্জাম দিতে বাধ্য আমেরিকা। এই প্রসঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, তাইওয়ান ইস্যুতে আমেরিকার নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

অন্যান্য বিষয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক: তাইওয়ান ছাড়াও হংকংয়ের কারাবন্দি গণমাধ্যম ব্যবসায়ী ও চীন-সমালোচক জিমি লাইয়ের মুক্তির বিষয়টি ট্রাম্প চীনের কাছে উত্থাপন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে হংকংয়ের বিষয়টিকে চীন বরাবরই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করে আসছে।
বড় কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি না হলেও, দুই দেশই তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করার ওপর জোর দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে অভিহিত করে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে বলেছেন, আমাদের অবশ্যই এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং কোনোভাবেই একে নষ্ট করা যাবে না।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-সিএনএন
