পারস্য উপসাগরের উত্তপ্ত জলরাশি আর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন এক ভয়াবহ মহাপ্রলয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। একদিকে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে কূটনৈতিক টেবিলে নতি স্বীকার না করার অনড় জেদ, সব মিলিয়ে ইরান-আমেরিকা সংঘাত এখন এক চরম বিস্ফোরক পর্যায়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করে এখন পুরো অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যখন পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে বসে বিশ্ব অর্থনীতি আর জ্বালানি সরবরাহ সচল করার পথ খুঁজছেন, ঠিক তখনই তেহরান থেকে ভেসে আসছে যুদ্ধের গর্জন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ ওয়াশিংটনকে এক হাত দেখে নিয়েছেন।
তার অভিযোগ, আমেরিকা মুখে আলোচনার মিষ্টি কথা বললেও গোপনে ইরানে সেনা পাঠানোর 'ব্লু-প্রিন্ট' সাজাচ্ছে। কলিবাফ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যতক্ষণ আমেরিকা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে চাইবে, আমাদের জবাব একটাই, আমরা কখনোই অপমান মেনে নেব না। কালিবাফ সোজা ভাষায় জানিয়েছেন, আমেরিকান স্থল অভিযানের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে প্রস্তুত ইরান।
রোববার রাতভর তেহরানের ওপর চড়াও হয়েছে ইসরাইলি বিমান বাহিনী। তাদের দাবি, তারা ব্যালিস্টিক মিসাইলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা এবং অস্ত্রাগার গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তবে, এই হামলার বলি হয়েছে সংবাদমাধ্যমও। তেহরানে কাতারভিত্তিক আল-আরাবি টিভির ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান কর্মীরা। ভিডিওতে দেখা গেছে, বহুতল ভবনটির দেয়াল আর জানালা উড়ে গেছে। অন্যদিকে, ইরানের ছোঁড়া মিসাইল বৃষ্টির কবলে পড়ে দক্ষিণ ইসরাইলের একটি শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, যেখানে বিপজ্জনক রাসায়নিক ও বর্জ্য শোধনাগার রয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের খবর অনুযায়ী, পেন্টাগন এখন ইরানে কয়েক সপ্তাহের স্থল অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা উভচর জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে। তবে আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন আর দেশের ভেতরে বাড়তে থাকা যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভের চাপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন শাঁখের করাত। তিনি কি যুদ্ধের মাত্রা বাড়িয়ে নিজের জনপ্রিয়তা আরও তলানিতে নামাবেন, না কি কোনো সমঝোতায় আসবেন- তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে আগুন লেগেছে। ইরান শুধু পাকিস্তানের পতাকাবাহী ২০টি জাহাজকে বিশেষ অনুমতি দিয়েছে প্রতিদিন দুটি করে যাওয়ার জন্য। কিন্তু বাকি বিশ্বের জন্য এই পথ এখন যমদূত। এর মধ্যে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি ইসরাইলে হামলা চালিয়ে যুদ্ধে যোগ দেওয়ায় লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীও এখন হুমকির মুখে।
ইউরোপীয় কূটনীতিকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সংঘাতের মাত্রা যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে আলোচনার সব পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। একদিকে ট্রাম্পের ১৫ দফার আল্টিমেটাম, অন্যদিকে ইরানের ‘সম্মান বাঁচানোর’ লড়াই- মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ আর বিশ্ব অর্থনীতি। মধ্যপ্রাচ্যের এই মরুঝড় শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
রণতরী আব্রাহামকে নাগালে পেলেই হামলা চালাবে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির খোঁজে ইসলামাবাদের চতুর্দেশীয় বৈঠক
পুতিন-ইরান ‘মধুচন্দ্রিমা’ দেখে আমেরিকার কপালে ভাঁজ!