যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমাবর্ষণ স্থগিত হওয়ার চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শান্তি চুক্তির দেখা নেই। শনিবার এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, তেহরান যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার জন্য একটি 'তাজা' প্রস্তাব দিলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনড় অবস্থানে তা ভেস্তে যাওয়ার পথে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ইতিহাসে চরমতম বিপর্যয়ের মাঝে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখন এক নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
গোপন কূটনৈতিক আলোচনার শর্তে ওই ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা পরমাণু ইস্যুটিকে আপাতত সরিয়ে রেখে যুদ্ধের অবসান এবং অবরোধ তুলে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন। ইরানের এই নতুন প্রস্তাবের মূল সারমর্ম হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গ্যারান্টি দেবে যে, তারা আর কখনও আক্রমণ করবে না, বিনিময়ে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট 'হরমুজ প্রণালী' খুলে দেবে।
একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রকেও ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে। ইরানের দাবি, জটিল পরমাণু ইস্যুটিকে আলোচনার শেষ ধাপে রেখে বর্তমান গুমোট পরিস্থিতি হালকা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এই প্রস্তাবে মোটেও সন্তুষ্ট নন। তার ভাষায়, ইরান এমন কিছু দাবি করছে যা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। ট্রাম্পের এই অনমনীয়তার মূল কারণ হলো পরমাণু অস্ত্র।
গত ফেব্রুয়ারিতে যখন তিনি এই যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, তখন তার প্রধান লক্ষ্যই ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ধূলিসাৎ করা। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইরান আর কখনও পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না, এমন গ্যারান্টি বা সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়া তারা এই যুদ্ধ শেষ করবে না।
গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিজস্ব জাহাজ ছাড়া অন্য সব নৌযান চলাচল বন্ধ করে রেখেছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে কড়া নৌ-অবরোধ আরোপ করে। বর্তমানে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা বিরাজ করছে। তেহরান মনে করছে, তারা পরমাণু আলোচনা পিছিয়ে দেয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে তা এক বড় ধরণের ‘ছাড়’, কিন্তু ট্রাম্পের কাছে এটি শুধু সময়ক্ষেপণের কৌশল মাত্র।
ইরান এখনও দাবি করছে তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রক্ষার ওপর অটল। এমনকি যদি তারা সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখতেও রাজি হয়, তবুও ওয়াশিংটনকে এই ‘অধিকার’ স্বীকার করে নিতে হবে, যা ট্রাম্পের রিপাবলিকান প্রশাসনের কাছে একটি 'নন-স্টার্টার' বা অগ্রহণযোগ্য বিষয়।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো এই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি এখন হোয়াইট হাউসের টেবিলে পড়ে থাকলেও, ট্রাম্পের ‘সন্তোষজনক নয়’ মার্কা মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, লোহিত সাগর আর পারস্য উপসাগরের আকাশে যুদ্ধের মেঘ এখনই কাটছে না। কূটনৈতিক এই 'দাবাড়ু'দের লড়াইয়ে বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেলের দাম আর ট্রাম্পের পরবর্তী মুভ-এর দিকে।
