মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের মাঝে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের হাহাকার কমাতে এবার 'ছায়া জাহাজে'র আশ্রয় নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানের কড়া নজরদারি আর সম্ভাব্য হামলা এড়াতে নিজেদের লোকেশন বা জিপিএস বন্ধ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে গোপনে তেল পাচার করছে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘অ্যাডনক’। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হলেও, নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখতে অত্যন্ত বিপজ্জনক এক পথ বেছে নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরান যেখানে নিজের দেশের তেল ছাড়া অন্য সব রপ্তানি বন্ধের হুমকি দিয়ে রেখেছে, সেখানে আমিরাত তাদের জিপিএস বা লোকেশন ট্র্যাকার বন্ধ করে সম্পূর্ণ অন্ধকারে হরমুজ প্রণালী পার করছে বিশাল সব তেলের ট্যাঙ্কার। সাধারণত নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া দেশগুলো যে কৌশলে তেল চুরি করে পাঠায়, এখন আমিরাত সেই একই কৌশলে বৈধ তেল বাজারে ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

শিপ-ট্র্যাকিং ডেটা এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এপ্রিল মাসে অ্যাডনক অন্তত ৬০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বের করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে ‘আপার জাকুম’ এবং ‘দাস’ গ্রেডের তেল ছিল। ইরানের ড্রোন হামলা থেকে বাঁচতে এই জাহাজগুলো তাদের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বন্ধ করে সাগরে ভেসেছিল।
যুদ্ধের কারণে আমিরাতের তেল রপ্তানি প্রতিদিন ৩১ লাখ ব্যারেল থেকে কমে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছিল। এই স্থবিরতা কাটাতেই তারা এখন ‘শিপ-টু-শিপ’ ট্রান্সফার পদ্ধতিতে তেল পাঠাচ্ছে। অর্থাৎ, বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল সরিয়ে দিয়ে তা মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া বা ওমানের স্টোরেজে পাঠানো হচ্ছে।

ঝুঁকি নিয়ে হরমুজ প্রণালী পার করা এই তেলের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। জানা গেছে, উত্তর-পূর্ব এশিয়ার একটি রিফাইনারিতে আমিরাতের ‘আপার জাকুম’ তেল নির্ধারিত দামের চেয়ে ব্যারেল প্রতি রেকর্ড ২০ ডলার বেশি প্রিমিয়ামে বিক্রি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কম থাকায় এবং অবরোধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ক্রেতারা যে কোনো মূল্যে এই তেল কিনতে মরিয়া।
এই গোপন মিশন মোটেও ঝুঁকিমুক্ত নয়। গত সোমবারই আমিরাত অভিযোগ করেছে, তাদের একটি খালি ট্যাঙ্কারে ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জিপিএস বন্ধ রেখে চললে সাগরে জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয় ঠিকই, কিন্তু ইরানের রেডার ফাঁকি দেয়া সব সময় সম্ভব হয় না।
তা সত্ত্বেও আমিরাত তাদের এই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আগামী মে মাসের জন্যও এশিয়ার রিফাইনারিগুলোর সাথে নতুন চুক্তির আলাপ চালাচ্ছে।

আমিরাত এই দুঃসাহসিক ঝুঁকি নিলেও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলো যেমন ইরাক, কুয়েত এবং কাতার তাদের তেল বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে অথবা তেলের দাম অস্বাভাবিক কমিয়ে দিয়েও ক্রেতা পাচ্ছে না। অন্যদিকে সৌদি আরব শুধুমাত্র লোহিত সাগরের নিরাপদ পথ ব্যবহার করে তেল পাঠাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, হরমুজ প্রণালী এখন একটি অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যেখানে টিকে থাকার লড়াইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের লোকেশন ট্র্যাকার বন্ধ করে অনেকটা ‘অদৃশ্য’ হয়েই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ঠিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ছায়া মিশনের সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপরই এখন নির্ভর করছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ভবিষ্যৎ।
