হরমুজ প্রণালী ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে যখন কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, ঠিক তখনই উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় পাবে না। তাঁর এই মন্তব্যের পর একদিকে যেমন যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপড়েন আরও জটিল রূপ নিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বার্ষিক পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, একটি বিষয় এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিত, সময়কে আর পেছনে ফেরানো যাবে না। এই অঞ্চলের মানুষ ও ভূখণ্ড আর কখনোই মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য সুরক্ষাকবচ বা ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। গত মার্চ মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। তবে তাঁর এই প্রথম জোরালো বার্তাটিকে ওয়াশিংটন এবং মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি তেহরানের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

ইরানের পক্ষ থেকে এই কঠোর বার্তাটি এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এলো, যখন দোহার মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা হ্রাস এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। চলমান এই আলোচনার মধ্যেই গত সোমবার দক্ষিণ ইরানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নতুন করে বিমান হামলা চালায়, যা তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। এই হামলার পরই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মন্তব্য করেছেন, ইরানের সাথে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছাতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনি এ বক্তব্য মূলত বর্তমান সংকটকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। ইরান মূলত মার্কিন নিরাপত্তা প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে এই অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী জোট গড়ার আহ্বান জানাচ্ছে। তবে এই কড়া হুঁশিয়ারির ফলে বাহরাইন, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। কারণ এই ঘাঁটিগুলোই উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির মূল কেন্দ্রবিন্দু।

তবে মাঠপর্যায়ে বাগযুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পর্দার অন্তরালের কূটনৈতিক আলোচনা বা ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির টেবিলে নিজেদের পাল্লা ভারী রাখতে এবং আমেরিকার ওপর কৌশলগত চাপ বজায় রাখতেই ইরান এই ধরনের কঠোর অবস্থান প্রদর্শন করছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে চরম পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং একের পর এক সামরিক পাল্টা আঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর যুদ্ধ এড়ানোর এই ভঙ্গুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
