সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে নিজেদের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে পশ্চিমা ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। বুধবার ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিস্ফোরক বিবৃতিতে এই দাবি করা হয়েছে।
তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রণক্ষেত্রে পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে শত্রু রাষ্ট্রগুলো এখন ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ, সাইবার হামলা, সন্ত্রাসবাদ এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মতো বহুমুখী গোপন ‘গোয়েন্দা-নিরাপত্তা যুদ্ধ’ তীব্রতর করেছে।
গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সামরিক যুদ্ধে পরাজিত শত্রু এখন তথাকথিত ‘সফট ওয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের জন্য কিছু অর্জন খোঁজার চেষ্টা করছে। এতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক যুদ্ধ চলাকালীন এই বৈরী শক্তিগুলো প্রকাশ্যেই ইরানের শাসন ব্যবস্থার পতন এবং দেশটিকে খণ্ড-বিখণ্ড বা বিভক্ত করার এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। তবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর প্রতিরোধের মুখে তাদের সেই সামরিক উদ্দেশ্য ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের এক উস্কানিমূলক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেই শহীদ হওয়ার পর, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন শুরু করে।
ইরানও বসে থাকেনি; তাৎক্ষণিক পাল্টা আঘাত হিসেবে তারা ইসরায়েলি ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থ লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। রণাঙ্গনের সেই সংঘাতের পর শত্রুরা এখন সরাসরি লড়াই বাদ দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে ফাটল ধরাতে ‘নরম, জ্ঞানীয় এবং হাইব্রিড যুদ্ধ’ এর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাটি জানিয়েছে।
বিবৃতিতে শত্রুপক্ষের বর্তমান নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের বেশ কয়েকটি অগ্রাধিকার ভিত্তিক ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও কঠোর করা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের সংকটকে পুঁজি করে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করা।

আর এই কাজে তারা মাঠপর্যায়ে বিদেশি মদদপুষ্ট এজেন্ট এবং দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত ফার্সি ভাষার বেতনভোগী গণমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া ইরানের জাতীয় সংহতি নষ্ট করতে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী এবং সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কৃত্রিমভাবে জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরির অপচেষ্টা চলছে বলেও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে।
একই সাথে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, বিশেষ করে ইরানের উত্তর-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত এলাকায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর জন্য ইহুদিবাদী ইসরায়েল সমর্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে নতুন করে মোতায়েন করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক যুদ্ধ চলাকালীন এই গোষ্ঠীগুলো সমন্বিত স্থল হামলা চালানোর চেষ্টা করলেও ইরানি গোয়েন্দাদের নিখুঁত নজরদারিতে তাদের অবস্থান ফাঁস হয়ে যায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর পাল্টা আঘাতে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। বর্তমানে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড (অ্যাসাসিনেশন), কৌশলগত স্থাপনায় নাশকতা, অস্ত্র চোরাচালান, সাইবার হামলা এবং স্টারলিংকের মতো অবৈধ স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তির অবৈধ অনুপ্রবেশকে চিহ্নিত করেছে মন্ত্রণালয়।
সবশেষে, ইরানের বিরুদ্ধে এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ছড়ানোর পেছনে সরাসরি মদদ দেওয়ার জন্য বিবিসি পার্সিয়ান, ভয়েস অব আমেরিকা এবং ইরান ইন্টারন্যাশনালের মতো নামী বিদেশি ফার্সি ভাষার সংবাদমাধ্যমগুলোর তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা জানিয়েছে তেহরান।
