আবারও কি নতুন করে শুরু হচ্ছে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ?

সমঝোতার মেয়াদ শেষ

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকটি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়াদ উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে, এই চুক্তিটির মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে দুই দেশের কারো পক্ষ থেকেই ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত মেলেনি।

মূল চুক্তি অনুযায়ী, একটি স্থায়ী চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের ৬০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসার কথা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দু’দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় আলোচনার ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।


ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় আলোচনায় বসার বিষয়ে ইরান এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে, তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হচ্ছে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে।

এদিকে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের একটি বিকল্প ও নিরাপদ পথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আরাগচি বলেন, আমরা বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নৌ-পথের নকশা তৈরি করছি, যা পরবর্তী ধাপে স্থায়ী রূপ নেবে। খুব শিগগিরই আমরা এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে অন্যান্য শর্ত পূরণের ওপর, যা মেনে চলতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে আমেরিকা খুব শিগগিরই এই অতি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেবে।


সমঝোতা স্মারকে আসলে কী ছিল
?

গত ১৭ জুন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধ বন্ধ করা, যাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান রুট পারস্য উপসাগরীয় নৌ-বাণিজ্য কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল ও বিতর্কিত বিষয়গুলোকে পরবর্তী আলোচনার জন্য আলাদা রাখা হয়েছিল। তবে এর মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং লেবাননের চলমান সংঘাতের একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা।


চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং এই যুদ্ধে তাদের সহযোগীরা এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে। এবং এতদ্বারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না এবং শক্তি প্রদর্শন বা আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও লেবাননের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করা থেকে বিরত থাকবে।

চুক্তিতে আরও বলা হয়, চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে সকল ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা হবে এবং অনধিক ৬০ দিনের মধ্যে এটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হবে; তবে উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হতো এবং ইরানের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন প্যাকেজের কাজ শুরু করতে হতো। পাশাপাশি ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির ওপর ছাড় প্রদান এবং বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের ইরানি অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার শর্তও যুক্ত ছিল।

এর বিনিময়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন অপসারণ করা এবং অন্তর্বর্তীকালীন ৬০ দিনের জন্য বিনা শুল্কে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে বলা হয়েছিল। এছাড়া ইরান পুনরায় প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করবে না এবং বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে।


কতটা সফল ছিল এই সমঝোতা স্মারক
?

চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ ঘণ্টাও পার হয়নি, তার আগেই এর মূল বিষয়বস্তু ও ব্যাখ্যা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দেয়। এটি কি নিছক সাময়িক যুদ্ধবিরতি নাকি স্থায়ী শান্তিচুক্তি, আর কার কী দায়িত্ব, তা নিয়ে তৈরি হয় টানাপোড়েন।

চুক্তির দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুনরায় গোলাগুলি শুরু হয়। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ওই অঞ্চলে ইরানের হামলাগুলো চুক্তির একটি বোকা মতো লঙ্ঘন। অন্যদিকে ইরান দাবি করে, মার্কিন বিমান হামলা সমঝোতা স্মারকের ১ নম্বর অনুচ্ছেদকে সরাসরি ক্ষুণ্ন করেছে।

গত ৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, এই চুক্তি শেষ হয়ে গেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রাখে। এর জবাবে তেহরান জানায় যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন ও স্থগিত করেছে, তাই ইসলামি প্রজাতন্ত্রও নিজেদের প্রতিশ্রুতি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।

এরপর থেকে যুদ্ধটি মূলত ক্ষমতার লড়াই এবং অর্থনৈতিক সহ্যক্ষমতার পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে, যার কোনো সমাধান চোখে পড়ছে না। তবে জুলাইয়ের শেষের পর থেকে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন বিমান হামলার কোনো আনুষ্ঠানিক খবর পাওয়া যায়নি।


সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে
?

সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে দুই দেশের মূল্যায়ন ভিন্ন। উভয় দেশই যুদ্ধে নিজেদের বিজয়ী হিসেবে দাবি করছে। তবে কোনো স্থায়ী সমাধান না থাকায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগারে গোলাবারুদের মারাত্মক ঘাটতির খবরের মধ্যে, ট্রাম্প এখন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদী এবং শেষহীন যুদ্ধে টেনে নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সিএনএন’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরিষ্কার করেছেন, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করাই বর্তমানে ওয়াশিংটনের মূল কৌশল। চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেন, আমরা শুধু দেখছি কীভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থের অভাবে ইরান ভেঙে পড়ছে। তবে তেহরান নিজের অবস্থানে অনড়। ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জনে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, আমি অন্তরের অন্তস্তল থেকে ঘোষণা করছি, আমরা এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছি।

উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যের মধ্যে ছিল ইরানের পূর্ণ আত্মসমর্পণ, সরকার পরিবর্তন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি চিরতরে বন্ধ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহর মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর তেহরানের সমর্থন ও অর্থায়ন সম্পূর্ণ বন্ধ করা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-রয়টার্স-সিএনএন-এনডিটিভি

একাত্তর/এআরএস
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের খসড়া পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিবেশী দেশ ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান। সোমবার ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের...
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরে ওয়াশিংটনের নেওয়া পদক্ষেপে যদি উপসাগরীয় দেশ ওমান কোনো বাধা সৃষ্টি করে, তবে সে দেশেও বিধ্বংসী সামরিক হামলা চালানোর নজিরবিহীন হুমকি দিয়েছেন মার্কিন...
ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে হোয়াইট হাউসের উচ্চপর্যায়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে বলে এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন সাবেক মার্কিন কংগ্রেসউইম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিন। রোববার...
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে চলমান সামরিক সংঘাত ও টানটান উত্তেজনার মধ্যেই রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। বাহিনীটির রাজনৈতিক...
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. মো. নাসিমুল গনি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। দুই বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের দিন সোমবার (১৭ আগস্ট)...
ভ্রমণের আনন্দ এক নিমেষেই রূপ নিল সীমাহীন শোকে। বরগুনার পায়রা নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ৩৩ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হলো রাবেয়া আক্তার জুঁই (১৫) নামের এক স্কুলছাত্রীর ভাসমান মরদেহ।
তিন-তিনটি ফাইনালে উঠেও শিরোপা ছোঁয়া হয়নি, স্বপ্নভঙ্গের সেই তিক্ত অতীতকে পেছনে ফেলে অবশেষে আফ্রিকান ফুটবলের শীর্ষ সিংহাসনে বসলো ক্যামেরুনের অদম্য নারীরা!
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করলেও পরাজিত হননি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর