ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানে যেসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও নৌপরিবহন সংস্থা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে লজিস্টিক সহায়তা যোগাচ্ছে, তাদের ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছে তেহরান। এ ধরনের সহায়তায় জড়িত আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর আইনি, অর্থনৈতিক ও প্রতিশোধ ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।
সোমবার ইরানের সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির স্বনামধন্য সংবাদ সংস্থা 'নূরনিউজ' এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই হুঁশিয়ারির কথা প্রকাশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইতিমধ্যে সেইসব বাণিজ্যিক কোম্পানি, ব্যক্তি মালিকানাধীন জাহাজ ও সামুদ্রিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শুরু করেছে, যারা মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন বাহিনীকে নানাভাবে রসদ সরবরাহ করছে।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের নথিপত্র উদ্ধৃত করে জানান, আমেরিকান সামরিক বাহিনী জ্বালানি, গোলাবারুদ, সামরিক সরঞ্জাম ও খাদ্য বহনের জন্য প্রচুর সংখ্যক বেসরকারি ও বাণিজ্যিক জাহাজ ব্যবহার করছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে শুধু সাধারণ বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই; কারণ এই সরবরাহ শৃঙ্খল সরাসরি মার্কিন বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা ও আক্রমণাত্মক তৎপরতাকে বাঁচিয়ে রাখছে।
ইরানি কর্মকর্তা জানান, কোনো কোম্পানি বা জাহাজের জাতীয়তা, নিবন্ধিত দেশের পতাকা কিংবা বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারীদের ছদ্মবেশ দেখে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। প্রকৃত ভূমিকার ওপর ভিত্তি করেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করা হবে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে কোনো কোম্পানি, জাহাজের মালিক, অপারেটর, শিপ ম্যানেজার, মেরিন সার্ভিস ফার্ম বা বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, যারা জেনে-বুঝে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে অত্যাবশ্যকীয় রসদ পরিবহনে অংশ নিচ্ছে, তাদের সামরিক লজিস্টিক সমর্থক হিসেবে গণ্য করা হবে। উপযুক্ত নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ইতোমধ্যে মার্কিন সামরিক চুক্তির অধীনে নিয়োজিত বেশ কিছু আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন জায়ান্ট ও বিশিষ্ট কোম্পানির ওপর নজরদারি ও তদন্ত বাড়িয়েছে তেহরান। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপিং প্রতিষ্ঠান মার্স্ক, স্কাইলার লাইন নেভিগেশন, ক্রাউলি গভর্নমেন্ট সার্ভিসেস, ওভারসিজ শিপহোল্ডিং গ্রুপ, সিবাল্ক ট্যাঙ্কার্স এবং প্যাট্রিয়ট কন্ট্রাক্ট সার্ভিসেস।
এছাড়া মার্কিন সামরিক রসদ সরবরাহে যুক্ত থাকার অভিযোগে কর্সিকা, গুডউইল, হাওয়াই, সেভার্ন, লিবার্টি পাওয়ার, টর্ম টিমোথি, ওভারসিজ মাইকোনোস, স্টেনা পোলারিস, মার্স্ক পিয়ারি সহ একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট জাহাজের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে ইরানি গোয়েন্দারা।
তবে সামরিক কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, তালিকায় নাম থাকাই সমান অপরাধ নির্দেশ করে না। তদন্ত ও নথি যাচাই-বাছাই শেষেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায় ও অংশগ্রহণের মাত্রা নির্ধারণ করা হবে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে এই তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এবং তালিকার বাইরেও অন্য কোনো কোম্পানি মার্কিন লজিস্টিকসে যুক্ত পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইরানি কর্মকর্তা তাঁর বক্তব্য শেষ করেন এক চরম সতর্কবার্তার মাধ্যমে, যুদ্ধের মাসুল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। যারা জেনে-বুঝে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক অবকাঠামো জোগাবে, তাদের কার্যক্রম কখনো গোপন থাকবে না এবং তাদের এর মাশুল গুণতেই হবে।
