মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়ে এক চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরান তাদের বোমা তৈরির উপযোগী অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল ভাণ্ডার চিরতরে সিলগালা করার জন্য এক নজিরবিহীন ও চরম আগ্রাসী পদক্ষেপ নিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জনসমক্ষে ইরান থেকে এই ইউরেনিয়াম সামরিক শক্তিতে জব্দের হুমকি দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তেহরান তাদের পরমাণু বাঙ্কারের প্রবেশপথগুলোতে বিস্ফোরক মাইন পুঁতে দিয়েছে এবং ভেতরের টানেলগুলো ডিনামাইট দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ধসিয়ে দিয়েছে।
এর ফলে ইরানের মাটির নিচে থাকা প্রায় আধ-টন অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নাগাল পাওয়া এখন এক মাস আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি কঠিন, বিপজ্জনক এবং সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। ইরানের এই রণকৌশল ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির সমীকরণকে চরম জটিলতার মুখে ফেলে দিয়েছে।

চলমান যুদ্ধ অবসান এবং ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার জন্য ওয়াশিংটনের প্রধান শর্তই ছিল এই ইউরেনিয়াম মার্কিন হেফাজতে হস্তান্তর করা। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, দু’দেশ এমন চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে যেখানে ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমেরিকার হাতে তুলে দেবে, যা অন-সাইটেই ধ্বংস করে দেশ থেকে সরিয়ে নেয়া হবে।
কিন্তু এই সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। এর মাঝেই গত শুক্রবার একটি আধা-সরকারি ইরানি সংবাদসংস্থায় এই খসড়া চুক্তির কিছু অংশ ফাঁস হয়ে গেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এই বাঙ্কারগুলো এমনভাবে মাইন দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে যে, স্বয়ং ইরানিদের পক্ষেও এখন এই ইউরেনিয়াম বের করা অত্যন্ত দুরূহ ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এর জন্য বিশাল খননকারক দল ও মাইন নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের প্রয়োজন পড়বে।
২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মার্কিন ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পরমাণু উপাদান অপসারণ দপ্তরের প্রধান স্কট রোয়েকার বলেন, খবর সত্য হলে ইউরেনিয়াম উদ্ধার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। চুক্তি অনুযায়ী ইরান যদি সব ইউরেনিয়াম এক জায়গায় এনে আন্তর্জাতিক সংস্থাকে যাচাই করতে না দেয়, তবে তারা সহজেই ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাবে।

তেহরান হয়তো দাবি করবে যে বাঙ্কার ধসে যাওয়ার কারণে কিছু ইউরেনিয়াম চিরতরে হারিয়ে গেছে এবং তা আর উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ফলে আমেরিকার মনে সবসময় একটা ভয় থেকে যাবে যে ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপাদান লুকিয়ে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের ধারণা, ইরানের এই অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সিংহভাগই রাখা আছে দেশটির মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের ভূগর্ভস্থ টানেলে। গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই পরমাণু সম্পদ জোরপূর্বক জব্দ করার জন্য একটি বিশেষ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণে শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়।
তবে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, মার্কিন গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে ইরানিরা কখনোই এই মাটির নিচের উপাদান বের করতে পারবে না। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যেভাবে প্রকাশ্য জনসভায় এই ইউরেনিয়াম বাঙ্কারকে আমেরিকার সম্ভাব্য টার্গেট হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, তাতেই মূলত ইরান সতর্ক হয়ে বাঙ্কারগুলো ধ্বংস ও মাইন পুঁতে রাখার চূড়ান্ত প্রেরণা পেয়েছে।

যদি আগামী সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি সইও হয়, তাও এই ইউরেনিয়াম ইরান থেকে বের করে আনা একটি কারিগরি যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। এই কাজের জন্য আমেরিকার টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিশেষ মোবাইল ইউরেনিয়াম অপসারণ সুবিধার প্রয়োজন হবে।
চলতি মাসের শুরুতেই ট্রাম্পের শীর্ষ আলোচক জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ এই ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করেছিলেন। তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন এই কাজে মাত্র দুই সপ্তাহ লাগবে, কিন্তু পরমাণু বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরানের এই নতুন বিস্ফোরক ফাঁদ ও ধসে পড়া বাঙ্কারের ভেতর থেকে ইউরেনিয়াম বের করতে বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞদেরও এখন মাসের পর মাস সময় লেগে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
