মধ্যপ্রাচ্যের তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সই হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টাসের্র এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, এই ঐতিহাসিক চুক্তির পরও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংশয় ও অস্পষ্টতা কাটছে না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও আন্তর্জাতিক জাহাজ মালিকেরা বলছেন, এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরে আসতে আরও কয়েক সপ্তাহ বা মাস পেরিয়ে যেতে পারে।
বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-৭-এর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্সে পৌঁছানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, চুক্তিটি সই হয়ে গেছে। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন, তেলবাহী জাহাজগুলো ইতিমধ্যে প্রণালীর নিরাপদ ও সুরক্ষিত ‘দক্ষিণ হাইওয়ে’ ধরে চলাচল শুরু করেছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই চুক্তিতে সই করবেন।
তবে চুক্তির অনেক মৌলিক ও জটিল প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি মূলত গত এপ্রিলে ঘোষিত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়িয়ে দেবে। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর থেকে ইরান কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো, যা এখন খুলে দেওয়া হবে। আলোচকেরা জানিয়েছেন, এই ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী ধাপের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল দরকষাকষি হবে।
বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল বাণিজ্য হওয়া এই সংকীর্ণ জলপথের অবরোধ প্রত্যাহারের খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম গত ১০ মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ০.৩% কমে ব্যারেল প্রতি ৮২.৯৬ ডলারে থিতু হয়। তবে মঙ্গলবার দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে, যা বিশ্ব বাজারের একটি সতর্ক মনোভাবেরই প্রতিফলন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক বার্তায় একে যুদ্ধ বন্ধের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করলেও স্বীকার করেছেন যে, একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির চূড়ান্ত চুক্তি এখনো রূপ নেয়নি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি একটি ‘খুবই সাধারণ নথি’। তবে এতে ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের প্যাকেজ রয়েছে।
খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার এবং মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধের শর্ত পূরণ করে, তবে তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশি সম্পদ অবমুক্তকরণ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল পেতে পারে।
চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে এখনই জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না পণ্য পরিবহনকারীরা। ৯০০-এর বেশি ট্যাঙ্কার ও জাহাজের মালিক জাপানের অন্যতম শীর্ষ নৌ-পরিবহন কোম্পানি ‘মিতসুই ও.এস.কে. লাইন্স’ -এর প্রধান নির্বাহী ফিনান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের চুক্তিটি শতভাগ কার্যকর বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এই রুটে জাহাজ পাঠাবেন না। তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত দুই সপ্তাহ থেকে এক মাস সময় লাগবে।
চুক্তির অন্যতম বড়ো জটিলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে লেবানন সীমান্ত। ইরান দাবি করেছে, এই চুক্তির সফলতার জন্য লেবাননে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা সরাবে না এবং হিজবুল্লাহর যেকোনো হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের থাকবে। সোমবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ইরান চেয়েছিলো আমরা সেখান থেকে সরে যাই, কিন্তু আমি আমার অবস্থানে অটল ছিলাম।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ শুরু করার পেছনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক বন্ধের যে দাবি তুলেছিলেন, তা এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মূল আলোচ্যসূচিতে না থাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।
