পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের চরম খরা কাটিয়ে এক নাটকীয় রূপকথার জন্ম দিয়েছেন মোতাব শেখ। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া থেকে শুরু করে বিধানসভার দোরগোড়ায় পৌঁছানো, ফারাক্কার এই নবনির্বাচিত বিধায়কের জয় যেন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।
এক মাস আগেও যাঁর পরিচয় ছিল ‘ভোটাধিকার হারানো এক সাধারণ মানুষ’, আজ তিনিই পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় কংগ্রেসের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা দুই কাণ্ডারির একজন। ফারাক্কা বিধানসভা কেন্দ্রের মোতাব শেখ শুধু জয়ীই হননি, বরং শাসকদল তৃণমূলকে তৃতীয় স্থানে ঠেলে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, আইনি লড়াই আর জনসমর্থন এক হলে ভাগ্য বদলাতে সময় লাগে না।

স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশনের (এসআইআর) গেরোয় পড়ে মোতাব শেখের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল। অভিযোগ ছিল, ২০০২ সালের নথির সাথে বর্তমান নামের বানানে অমিল। যেখানে সাধারণ মানুষ আশা ছেড়ে দেন, মোতাব সেখানে কড়া নেড়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের দরজায়।
গত ৫ এপ্রিল, মনোনয়নের শেষ দিনের ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে শীর্ষ আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেয়। আধার কার্ড ও পাসপোর্টকে বৈধ পরিচয়পত্র মেনে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে নির্বাচনে লড়ার ছাড়পত্র দেয়। ৬ এপ্রিল কোনোমতে মনোনয়ন জমা দিয়ে লড়াই শুরু করেন এই পেশাদার ঠিকাদার।

ফারাক্কায় মোতাব শেখ পেয়েছেন ৬৩,০৫০ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীকে ৮ হাজারের বেশি ব্যবধানে হারিয়ে তিনি যখন জয়োল্লাস করছেন, তখন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের স্থান হয়েছে তৃতীয়। এই জয় নিয়ে মোতাব বলেন, আমি পৃথিবীর অন্যতম ভাগ্যবান মানুষ। ভেবেছিলাম ভোটই দিতে পারব না, আর আজ জনগণ আমাকে বিধায়ক বানাল। এটা মানুষের জয়।
উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়া ২৭ লাখ মানুষের মধ্যে শুধু ফারাক্কাতেই বাদ পড়েছিলেন ৩৮ হাজার জন। মুর্শিদাবাদ জেলায় এই সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ, ১১ লাখেরও বেশি। মোতাবের এই জয় সেসব ‘বাতিল’ ভোটারদের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।

আইনি জটিলতার কারণে মোতাব প্রচারের জন্য সময় পান মাত্র দুই সপ্তাহ। অর্ধেক কেন্দ্রে পৌঁছাতেও পারেননি তিনি। তাঁর দাবি, যদি আরও একটু সময় পেতাম, তবে জয়ের ব্যবধান আরও কয়েক গুণ বাড়ত। দীর্ঘদিনের তৃণমূল বিধায়ক আব্দুল সৌমিক হোসেনকে হারিয়ে এই জয় কংগ্রেসের জন্য সঞ্জীবনী সুধার মতো কাজ করেছে। মুর্শিদাবাদেরই রানিনগর আসনটি জিতে কংগ্রেসের মান রেখেছেন জুলফিকার আলীও।
নির্বাচনী জয়ের পর মোতাবের নিশানায় শাসকদলের দুর্নীতি ও বিধায়কদের জনবিচ্ছিন্নতা। তিনি বলেন, মানুষ তৃণমূলের দুর্নীতি আর অপশাসনে ত্যক্ত-বিরক্ত ছিল। তারা কংগ্রেসের ওপর আস্থা রেখেছে। রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলেও এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে তিনি নতুন সরকারের সাথে সংঘাত নয়, বরং সহযোগিতার পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পানীয় জলের সমস্যা সমাধান এবং ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সাধারণ মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই জয়কে নির্বাচন কমিশনের ‘অসম লড়াইয়ের’ বিরুদ্ধে নৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোতাব শেখের এই উত্থান বুঝিয়ে দিল, রাজনৈতিক সমীকরণ যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের দোয়া আর সঠিক সময়ে আইনি হস্তক্ষেপ থাকলে ‘শূন্য’ থেকেও শুরু করা সম্ভব। এখন দেখার বিষয়, বিধানসভার ভেতরে এই দুই ‘কংগ্রেসি বীর’ কতখানি গর্জে উঠতে পারেন।
