‘বাবা, একদিন আমি বড় অফিসার হব, আর তোমার নাম উজ্জ্বল করব’- স্বপ্নের শহর দিল্লিতে পড়তে এসে বাবাকে দেওয়া এই কথাটি আর রাখা হলো না ১৯ বছর বয়সী মেধাবী তরুণ অক্ষত সিং যাদবের। দিল্লির ঐতিহ্যবাহী পিজিডিএভি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অক্ষতের স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই ধুলিসাৎ হয়ে গেল সত্য নিকেতনের সেই মর্মান্তিক ভবন ধসে। যে তরুণ তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বাবা-মাকে গর্বিত করার স্বপ্ন বুনছিল, দিল্লির সেই ভবন ধসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত সাতজনের মধ্যে তার নামটি যুক্ত হয়ে পরিবারটিকে এক অসীম বেদনার সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে।
খবর পেয়ে সোমবার সকালে দিল্লির এইমস ট্রমা সেন্টারে পৌঁছায় অক্ষতের পরিবার। ছেলের নিথর দেহ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মা-বাবা, আর একমাত্র ভাইটিকে হারিয়ে গভীর মানসিক আঘাতে স্তব্ধ হয়ে গেছে বোন লিচির কণ্ঠ। অক্ষতের মূল বাড়ি মধ্যপ্রদেশের কাটনির দুবে কলোনিতে। তার বাবা রাজস্থানের কোটায় কর্মরত এবং মা গৃহিণী। মৃত্যুর ঠিক দু দিন আগে মায়ের সঙ্গে শেষবার ভিডিও কলে কথা হয়েছিল অক্ষতের।

ফোনে ছেলের হাসিমুখের ছবিটির দিকে তাকিয়ে কান্না সামলাতে পারছিলেন না মা। বিলাপ করতে করতে তিনি বললেন, যে সন্তানকে ৯ মাস গর্ভে ধারণ করেছি, যাকে সযত্নে মানুষ করেছি, আজ আমাকে তার মরদেহ দেখতে হচ্ছে। আমরা চারজনের পরিবার ছিলাম, আজ থেকে আমরা আর তিনজন হয়ে গেলাম।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সদ্য শেষ হওয়া রক্ষা বন্ধনে বাড়ি এসেছিল অক্ষত। বাবা তাকে আরও কিছুদিন থাকতে বললেও ট্রেনের টিকিট কাটা হয়ে যাওয়ায় তড়িঘড়ি দিল্লিতে ফিরে আসে সে। তরোয়াল সংগ্রহের এক অদ্ভুত শখ ছিল অক্ষতের। মৃত্যুর আগে ২৫০০ রুপি দিয়ে একটি সুদৃশ্য তরোয়াল কিনে বাড়িতে পাঠিয়েছিল সে। ভিডিও কলে সেটি দেখতে পেয়ে অক্ষত উচ্ছ্বসিত হয়ে বোন লিচিকে তরোয়ালটি যত্ন করে তুলে রাখতে বলেছিল। আজ কেবল এই ছোট ছোট স্মৃতিগুলোই বেঁচে রইল স্বজনদের বুকে।

শিক্ষকরা সবসময় অক্ষতের পড়াশোনার প্রশংসা করতেন। অতিরিক্ত টাকা পেলেই তা দিয়ে বই কেনা আর বিভিন্ন কুইজ ও মেধা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশসেবা করার তীব্র বাসনা ছিল তার মনে। মদ বা কোনো ধরনের বাজে অভ্যাসে সে যুক্ত ছিল না; ছুটিতে বাড়ি এলে পরিবারকেই সময় দিতে ভালোবাসত।
ছেলের এমন করুণ মৃত্যুর পর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনকে। কান্নাভেজা কণ্ঠে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, মানুষ চরম বিশ্বাস নিয়ে সন্তানকে পড়াশোনার জন্য এসব ভবনে পাঠায়। আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি আমাদের ছেলে সেখানে এত অসুরক্ষিত থাকবে। প্রশাসন কেন সময়মতো ভবনগুলোর নিরাপত্তা পরীক্ষা করে না? সদ্য ঘটে যাওয়া নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা স্মরণ করে তিনি যোগ করেন, নিজের সন্তানকে না হারালে অন্য পরিবারের স্বজন হারানোর যন্ত্রণা হয়তো কোনোদিন পুরোটা অনুভব করতে পারতাম না।
অক্ষতের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, ইউপিএসসি-র লালিত স্বপ্ন আর পরিবারের অনেক আশা, সবই আজ সত্য নিকেতনের সেই ভাঙা ইট-পাথরের নিচে চিরতরে ঢাকা পড়ে গেল।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
