- নজিরবিহীন সেনা-পুলিশের দুর্গ দিল্লি
- দিল্লিতে ২৪ হাজার জওয়ান মোতায়েন
- বিমান থেকে রেলস্টেশনে ধরপাকড়
- এক আন্দোলনকারীর জন্য ছয় পুলিশ
- ফাঁকা রাজপথ, বন্ধ ৪৫ মেট্রো স্টেশন
- ইন্টারনেট বন্ধ, রেস্তোরাঁয় নজরদারি
- শত শত ব্যারিকেড ও বিস্তৃত তল্লাশি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল রাজনীতির আবহে শনিবার সেন্ট্রাল দিল্লির রাজপথ দেখলে মনে হচ্ছিল এ যেন কোনো থ্রিলার সিনেমার সেট! না ছিল সাধারণ গাড়িঘোড়া, না ছিল মানুষের কোলাহল, চারিদিকে কেবল খাঁকি পোশাক, সিআরপিএফ জোয়ান আর ক্যামেরা হাতে ঝুলতে থাকা সাংবাদিকদের ভিড়। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজিপি) বহু প্রতীক্ষিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ আন্দোলন রুখতে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্র সরকার এমন এক দুর্গ গড়ে তুলেছিল, প্রতিবাদের আগুন ডানা মেলার আগেই তা একেবারে অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে গেল।

জুলাই মাসের প্রশ্নপত্র ফাঁস আন্দোলনের বিশৃঙ্খলা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আর কোনো ফাঁক রাখতে চায়নি প্রশাসন। জম্মু-কাশ্মীর ও ছত্তিশগড় থেকে উড়িয়ে আনা অতিরিক্ত ফোর্সহ প্রায় ২৩,০০০ সশস্ত্র জওয়ান এবং ২২১ কোম্পানি আধা সামরিক বাহিনী দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছিল পুরো দিল্লি। জন্তর মন্তরের ২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রায় ৩৭টি পয়েন্টে শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা বিশালাকার লোহার ব্যারিকেড ও রাস্তায় পেরেক বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ৪৫টি মেট্রো স্টেশন একযোগে বন্ধ করে দেওয়ায় শহরটি কার্যত এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। কোনো অটো বা ক্যাব চালক কনট প্লেসের দিকে যেতে রাজি হননি, আর পাটেল নগর বা যমুনা ব্যাংক স্টেশনে নামা তরুণদের দেহতল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদেই কেটে গেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

মাঠে নেমে প্রতিবাদের তো দূরস্ত, দিল্লির সীমানায় পৌঁছানোর আগেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আন্দোলনকারীদের ছেঁকে ধরে পুলিশ। যেখানেই একজন আন্দোলনকারীর দেখা মিলেছে, তাকে মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ফেলেছে ৬ থেকে ৮ জন পুলিশ কর্মী! রীতিমতো চাগাড় দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে পুরে দেওয়া হয়েছে পুলিশের বাসে। গত ২৪ ঘণ্টায় দিল্লি পুলিশ ৩,০০০ জনকে আটকের দাবি করলেও, সিজিপির দাবি এই সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়েছে। গুরগাঁওয়ের বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয় জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে, আর গাড়ির ভেতর অবরুদ্ধ করা হয় সিজিপির আইনি প্রধান রত্না সিংকে।

তবে দিনের সবচেয়ে চমকপ্রদ নাটকটি ঘটেছিল ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে! মুম্বাই থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে দিল্লি নামা মাত্রই সিজিপির শীর্ষ তিন মুখ- অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে বিমানের ভেতর থেকেই টেনে-হিঁচড়ে নামায় মহিলা পুলিশ। বিমানে গাদাগাদি জায়গার মধ্যে যাতে কোনো ধস্তাধস্তি বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি না তৈরি হয়, তার জন্যই চতুরতার সঙ্গে মহিলা পুলিশ মোতায়েনের এই মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। এর পাশাপাশি পুণে থেকে গোয়া এক্সপ্রেসে আসা ১৪ জন শিক্ষার্থীকে মধ্যপ্রদেশের ইতরাসি স্টেশনে এবং তেলেঙ্গানার ভলান্টিয়ারদের ভোপাল স্টেশনে ট্রেন থেকে নামিয়ে সোজা লক-আপে পুরে দেওয়া হয়।

বিশাল পুলিশি প্রহরা, সীমান্তে তল্লাশি আর গণ-আটকের কাছে আপাতত হার মানতে হয়েছে 'জন্তর মন্তর ২.০'-কে। ককপ্রোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের সমস্ত গতি ও ধার নিমিষেই কাড়ে নেয় দিল্লি পুলিশের এই অভূতপূর্ব ব্যারিকেড-প্রাচীর। রাজপথে আন্দোলনকারীদের চেয়ে পুলিশের সংখ্যা বহুগুণ বেশি থাকায়, প্রতিবাদের ঝড় শুরু হওয়ার আগেই তা স্তব্ধ হয়ে গেল ঠিকই, তবে রাজধানীর বুকে এই নজিরবিহীন কড়াকড়ি আর 'অঘোষিত জরুরি অবস্থা'র রেশ ছড়াতে শুরু করেছে দেশের কোণায় কোণায়!
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
