মিয়ানমারে সংঘাতের কারণে সীমান্তে তৈরি হওয়া অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভারত বাংলাদেশ একসাথে কাজ করার কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন ভারতের সাবেক কূটনীতিকরা। তারা মনে করেন আন্তর্জাতিক চাপ তৈরিতে দুই দেশেরই এক সাথে কাজ করা উচিত। তবে বাংলাদেশ কোনো জোট বা দেশের বলয়ে কখনো ছিলো না, ভবিষ্যতেও থাকবে না বলে মনে করেন তারা।
২০১৭ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের মুখে তখন রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণেই তাদের আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ। সেই রোহিঙ্গাদের কারণে এখন বহুমুখী সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বার বার রাখাইনে সংঘাত বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই ইস্যুতে বরাবরই নিরব ছিলো ভারতসহ অনেক মিত্ররাষ্ট্র।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের এবারের পরিস্থিতি ২০১৭ সালের মতো নয়। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে দেশটির নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে আলোচনায় উঠে আসে একসাথে কাজ করার প্রসঙ্গ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, আমরা ভারতের সাথে মায়ানমারের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলেছি। এবং এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একসাথে কাজ করবো বলে আলোচনা করেছি।
মিয়ানমারে সংঘাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন মিয়ানমারের সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরিতে বাংলাদেশ ভারত এক সঙ্গে কাজ করতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বিনা সিক্রি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত এক সাথে হলে যে কোন সমস্যার সমস্যার সমাধান করতে পারে। যার প্রমাণ আমরা গেলো দশ বছরে দিয়েছি। দুই দেশই নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে সমঝোতার জায়গায় পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত সমস্যা সমাধানসহ জলসীমা নির্ধারণের কাজ করেছে। মিয়ানমার সমস্যার সমাধান করতেও দুই দেশ একসাথে কাজ করবে।
বাংলাদেশে কাজ করা ভারতীয় কূটনীতিকরা বলছেন, গেলো এক দশকে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু বাংলাদেশ কখনোই তার পররাষ্ট্র নীতির বাইরে এসে কোন বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, বাংলাদেশ সব সময়ই নিজের বলয়ের মধ্যে থেকে সিদ্ধান্ত নেয়।
এখন মিয়ানমার সীমান্ত কিছুটা শান্ত। ভারত ইতিমধ্যেই মিয়ানমার সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করছে।
২ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ওপারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির সংঘর্ষ চলছে। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে ১২ দিন ধরে কখনো প্রচণ্ড গোলাগুলি, আবার কখনো থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।
রাখাইনে সংঘর্ষ, গোলাগুলি শুরু হলে উখিয়া সীমান্তের রহমতের বিল, টেকনাফের হোয়াইক্যং ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে ৩৩০ জন আত্মসমর্পণ করে অস্ত্র জমা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েন। তাদের বৃহস্পতিবার ফেরত পাঠানো হয়েছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের ক্ষমতা নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। ২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের তিনটি জাতিগত বিদ্রোহী বাহিনী একজোট হয়ে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে।
বাহিনীগুলো হল- তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি-টিএনএলএ, আরাকান আর্মি-এএ এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি-এমএনডিএএ। তারা শান, রাখাইন, চীন ও কেয়াহ রাজ্যে লড়াই চালাচ্ছে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সেনাপোস্ট দখল করে ইতোমধ্যে তারা সাফল্য দেখিয়েছে।
আরাকান আর্মি (এএ) এ জোটের অন্যতম অংশ। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনের সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর একটি সশস্ত্র বাহিনী এটি। তারা রাখাইনের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করছে।
রাখাইনে সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াইয়ের প্রভাব পড়ছে সীমান্তের এপারের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও। যুদ্ধের গুলি ও মর্টার শেল এসে পড়ছে এপারে। এরকম ঘটনায় অন্তত দু’জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন কয়েকজন। ঢাকায় মিয়ানমারের দূতকে ডেকে এসব ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানানো হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের হস্তান্তর করলো বিজিবি