অলিম্পিক গেমসকে বলা হয় গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ, অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর। দুনিয়া জুড়ে ক্রীড়াবিদদের স্বপ্ন এই অলিম্পিক। একজন ক্রীড়াবিদের স্বপ্ন থাকে গলায় একটি অলিম্পিক পদক ঝোলানো। আর এই স্বপ্নপূরণের জন্য একজন ক্রীড়াবিদের অধ্যাবসায় ও নিরলস পরিশ্রমের বহু অকল্পনীয় সব কাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অলিম্পিকের ইতিহাসজুড়ে। সেই ইতিহাসেরই একজন ইউসরা মারদিনি।
সিরিয়ার নাগরিক মারদিনি কৈশোরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে পালিয়ে শরণার্থী হিসাবে ২০১৬ এবং ২০২০ সালের অলিম্পিক গেমসে অংশ নিয়ে সাড়া জাগিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে ইউসরা মারদিনি যখন সিরিয়া থেকে পালিয়ে যান, তখন তার বয়স ছিলো ১৬ বছর। আজ তিনি ২৩ বছরের একজন দুর্দান্ত সাঁতারু।
তবে এই পর্যায়ে আসতে মারদিনির যাত্রাট খুব সুখের ছিলো না। সে যাত্রায় তার সঙ্গী ছিলেন তার বোন। তারা প্রথমে উড়োজাহাজে করে সিরিয়া থেকে লেবানন হয়ে তুরস্কে উড়ে যান। এরপর শুরু হয় এক অনিশ্চিত যাত্রা। তুরস্ক থেকে একটি নৌকায় চড়ে দুই বোন পাড়ি জমান গ্রিসের উদ্দেশ্যে।
দশ কিলোমিটারের সংক্ষিপ্ত সমুদ্রযাত্রাটি শেষ হবার কথা ছিলো মাত্র ৪৫ মিনিটে। কিন্তু, ইতোমধ্যেই বেহাল সেই নৌকাটি ২০ জনের বেশি যাত্রী নেয়াতে যাত্রা শুরুর ২০ মিনিটের মধ্যেই নড়বড়ে হয়ে উঠে। বাধ্য হয়ে বোনকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সমুদ্রে। তিন ঘন্টারও বেশি সাঁতরে কোনমতে তীরে পৌঁছান তারা।
মারদিনি ও তার বোনের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিলো জার্মানি। কারণ সেই সময়ে শরণার্থীদের জন্য দরজা খুলে রেখেছিল দেশটি। কিন্তু গ্রিস থেকে জার্মানি যাত্রাটি ছিলো আরও কষ্টের এবং বিপদ সংকুল। কখনও পাঁয়ে হেটে, আবার কখনও গাড়িতে। কিন্তু পদে পদে ছিলো বিপদ। সামাল দিতে হয়েছে দালালদেরও।
তবে শেষ পর্যন্ত জার্মানি পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন মারদিনি। কারণ তিনি জানতেন দেশটিতে পৌঁছালে পূরণ হবে অলিম্পিক গেসমে খেলার স্বপ্ন। হয়েছিলো তা। ২০১৬ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি রিও গেমসে অংশ নিয়েছিলেন জাতিসংঘের শরণার্থী অ্যাথলেট দলের সদস্য হয়েছে।

যদিও ১০০ মিটার বাটারফ্লাই হিটে তার পারফরম্যান্স মন মতো ছিলো না। ফাইনাল রাউন্ডের জন্য নির্বাচিত না হলেও কোন দুঃখ নেই সিরিয়ান এই সাঁতারুর। মারদিনির ভাষায়, তিনি শুধু অলিম্পিকের পতাকাই বহন করেননি বরং একটি বিশ্ব সম্প্রদায়ের আশা ও স্বপ্নকেও বহন করেছেন রিও আসরে।
ব্রাজিল থেকে ফিরে সাঁতারে আরও মনোসংযোগ দেন তিনি। পাশাপাশি শরণার্থীদের জন্য কাজ শুরু করেন মারদিনি। জাতিসংঘের সর্বকনিষ্ঠ মানবাধিকার শুভেচ্ছাদূত মনোনীত হয়ে, শরণার্থীদের পুনর্বাসন ও দক্ষতা অর্জনের বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত হন। খেলাধূলার প্রতি তরুণদের আকৃষ্ট করে তুলতেও কাজ করছেন তিনি।
এরিমধ্যে ইউসরা মারদিনির জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি সিনেমা। যা নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে এই সাঁতারুকে। শুধু কি তাই, ২০২৩ সালে টাইম সাময়িকীর বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকার মারদিনির নাম থাকার বিষয়টিকে তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
২০১৬ সালে রিও আসরে শরনার্থী অ্যাথলেট দলে ক্রীড়াবিদের সংখ্যা ছিলো মাত্র দশ জন। সেখানে এবার প্যারিস অলিম্পিকের শরণার্থী দলের হয়ে অংশ নিচ্ছেন ৩৭ জন অ্যাথলেট। আর যথারীতি এই দলটির পতাকা বহনের দায়িত্বে থাকছেন শরণার্থী অ্যাথলেটের প্রতীক হয়ে উঠা ইউসারা মারদিনি।
