চলতি বিশ্বকাপে সি-গ্রুপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে বাংলাদেশ শনিবার সকাল সাড়ে ৬টায় মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং ৫২ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফেরা পুচকে দেশ হাইতি। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সাথে ড্র করে ব্রাজিল যখন চাপে, তখন হাইতি শিবিরের লক্ষ্য বিশ্বকে চমকে দেওয়া।
তবে এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের আগে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের গল্প সামনে এসেছে। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে বসে নিজেদের ‘ছেঁড়া মন’ আর হাইতি ড্রেসিংরুমের হাঁড়ির খবর ফাঁস করেছেন সেখানে খেলা দুই হাইতিয়ান ফুটবলার, ডিফেন্ডার বাদিও স্ট্যানলি এবং স্ট্রাইকার জঁ ফিল্ডার।

২০১৬ সালে পিরোলাস নেগ্রাস ট্রায়াল দিয়ে হাইতি ছেড়ে ব্রাজিলে পাড়ি জমানোর সময় বাদিও স্ট্যানলির পকেটে ছিল একটি ছোট নোটবুক, যেখানে পর্তুগিজ শব্দ লিখে রাখতেন তিনি। স্বপ্ন ছিল ব্রাজিলের মাটিতে খেলার। কিন্তু ১০ বছর পর তাঁর নিজের দেশ যে ব্রাজিলের গ্রুপেই বিশ্বকাপে খেলবে, তা ভাবেননি বাদিও। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, তখন আনন্দ হয়েছিল, কিন্তু এখন ভয় লাগছে। মনটা যেন দুভাগে ছিঁড়ে গেছে। ব্রাজিল আর মরক্কোর মতো গ্রুপে থাকাটা ভীষণ ভীতি জাগানিয়া। তবে এটা একটা ভালোবাসার ম্যাচও হবে, কারণ হাইতির মানুষ ব্রাজিলকে পাগলের মতো ভালোবাসে।
চলতি মরসুমে রিও’র ক্লাবে যোগ দেওয়া ৩১ বছর বয়সী হাইতিয়ান স্ট্রাইকার জঁ ফিল্ডার অবশ্য ফরাসি অ্যাকসেন্টে পর্তুগিজ মিশিয়ে বেশ রসালো ও আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, কাগজে-কলমে হিসাব করলে ব্রাজিল আর হাইতি মিলে ম্যাচে অন্তত ১৫টা গোল হওয়া উচিত! এটাই ফুটবলের রূঢ় বাস্তবতা। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে জার্সি ফুটবল খেলে না, খেলে প্লেয়াররা। সেখানে সব নির্ভর করে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আর ইচ্ছাশক্তির ওপর।

নিজের সমর্থনের ব্যাপারে একদম লুকোছাপা না করে হেসেই খুন জঁ ফিল্ডার, আমি তো আর মিথ্যা বলব না, আমি হাইতির জন্যই গলা ফাটাব। কারণ আমি সবার আগে হাইতিয়ান। নিজের শিকড়কে তো ভুলতে পারি না! আর্জেন্টিনা বা অন্য দলের বিরুদ্ধে আমি ব্রাজিলকে সমর্থন করব, কিন্তু হাইতি বনাম ব্রাজিল ম্যাচে আমি শেষ পর্যন্ত হাইতির সাথেই আছি। তবে ব্রাজিল জিতলে সেই জয়ের একটুখানি ভাগ আমিও পাব, কারণ আমি এখন ব্রাজিলেই আছি!
ব্রাজিলের খতরনাক হাইতির তিন গোপন অস্ত্র: ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের যেখানে মাঠের ‘প্যাশন’ আর আগ্রাসন প্রধান শক্তি, সেখানে হাইতি খেলে ইউরোপীয় ঘরানার মেপে মেপে তৈরি করা নিখুঁত ফুটবল। সেলেসাও ডিফেন্সকে গুঁড়িয়ে দিতে হাইতির কোন কোন খেলোয়াড়ের দিকে নজর রাখতে হবে, তার একটি গোপন তালিকা দিয়েছেন বাদিও ও ফিল্ডার।

বাদিও’র মতে, মিডফিল্ডার ড্যানলি অত্যন্ত বিপজ্জনক। চোখের পলকে বক্সে ঢুকে নিখুঁত ও জোরালো শট মারতে ওস্তাদ ও। হাইতির ঐতিহ্যবাহী ৯ নম্বর জার্সিধারী স্ট্রাইকার ডাকেন্স নাজোঁ যে কোনো মুহূর্তে ডিফেন্স ভেঙে গোল করতে পারেন। দুর্ধর্ষ ডিফেন্ডার আদে মূলত হাইতি দলের অধিনায়ক এবং রক্ষণের আসল দেয়াল।এছাড়া গোলকিপার ডুভার্জার এবং ফুলব্যাক একুর্সের দিকেও নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
হাইতির রূপকথা: টানা রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটে জর্জরিত হাইতিতে ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইসে হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কোনো নির্বাচিত সরকার নেই। এমনকি বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচগুলোও তাদের খেলতে হয়েছে কুরাসাও’র মাঠে।

এই চরম যুদ্ধাবস্থার মাঝে ফুটবলই তাদের একমাত্র অক্সিজেন। স্ট্রাইকার জঁ ফিল্ডার আক্ষেপ করে বলেন, বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করাটাই আমাদের মতো দেশের জন্য এক বিশাল ব্যাপার। অনেকে আমাদের আন্ডারডগ ভেবে ছোট করছে, কিন্তু এটা শুধু একটা ফুটবল টিম নয়, এটা একটা পুরো জাতি। এই মুহূর্তে পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার একমাত্র সুতো হলো ফুটবল। যখন খেলা চলে, তখন অপরাধী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক, সবাই সব ভুলে একসাথে দেশের জন্য গলা ফাটায়।
মজার ব্যাপার হলো, দুই হাইতিয়ান ফুটবলার দেশের জন্য গলা ফাটালেও তাঁরা জানিয়েছেন, ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতির প্রভাব হাইতিতে এত বেশি, ম্যাচের সময় হাইতির বহু মানুষ সবুজ-হলুদ জার্সি পরেই মাঠে বা টিভির সামনে বসবেন। এখন দেখার বিষয়, আনচেলত্তির ব্রাজিল হাইতিকে উড়িয়ে দিয়ে ছন্দে ফেরে, নাকি ৫২ বছর পর ফেরা হাইতি ফুটবলবিশ্বে নতুন কোনো রূপকথার জন্ম দেয়!
