আটলান্টার মহাকাব্যিক সেমিফাইনালের কাউন্টডাউন শুরু হতেই ফুটবলের পারদ এখন মহাজাগতিক স্তরে পৌঁছে গেছে! বিশ্ব ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা যখন বুধবার ফাইনালে ওঠার মরণ-বাঁচন লড়াইয়ে নামছে, তখন এই ম্যাচের ডার্বি ঝাঁঝকে আরও উসকে দিলেন স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসি।
কেরিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসে, ৩৯ বছর বয়সে এই প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবলে থ্রি-লায়ন্সদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচকে ‘চরম স্পেশাল’ আখ্যা দিয়ে মেসি হুঙ্কার ছেড়েছেন, ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করে আরও একবার বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখতে সম্পূর্ণ তৈরি তাঁর আলবিসেলেস্তেরা।
দুই দলই অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুক্ষয়ী নাটক পার করে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছে। জুড বেলিংহ্যামের জাদুকরী জোড়া গোলে ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে নরওয়ের ভাইকিংদের বধ করেছে। অন্যদিকে, ১০ জনের সুইজারল্যান্ডের কঠিন প্রতিরোধ ভেঙে অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজের এক বিশ্বমানের গোল ওলটপালট করে দেয় সুইসদের অপরাজিত দেওয়াল; আর্জেন্টিনা ম্যাচ জেতে ৩-১ গোলে।

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও আইকনিক কিছু মুহূর্ত এই দুই দেশ উপহার দিলেও, মেসির অবিশ্বাস্য দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া হয়নি। আর সে কারণেই ম্যাচটি মেসির কাছে এত বেশি আবেগের।
১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনালের স্মৃতি এখনো আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। ইএসপিএন আর্জেন্টিনাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচের যা কিছু আমি দেখেছি বা মনে রেখেছি, তা শুধু ভিডিও আর ছবির মাধ্যমে, যা আমরা আর্জেন্টাইনরা প্রতিনিয়ত বারবার দেখি এবং নতুন করে বাঁচি। তবে এই দলটা প্রতিপক্ষ কে, তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। অবশ্যই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলাটা স্পেশাল, কারণ ওরা ফুটবলের এক পরাশক্তি।
নিজের ব্যক্তিগত রোমাঞ্চ প্রকাশ করে এলএমটেন আরও যোগ করেন, ব্যক্তিগতভাবে এই প্রথম আমি ওদের বিরুদ্ধে খেলব। ফুটবল বিশ্বে আমি ইংল্যান্ড ছাড়া আর সব বড় শক্তির মুখোমুখি হয়েছি। তাই এই ম্যাচটা আমার কাছে অন্যরকম সুন্দর। আমরা বিশ্বমঞ্চে একটা সেরা দলের বিরুদ্ধে নামছি এবং নিজেদের সেরা ফর্মে থেকেই লড়াইটা লড়ব।
মাঠের এই বৈরিতা অবশ্য ফুটবল ছাপিয়ে রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষতেও আঘাত করে। ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং পরবর্তীতে শতাব্দীর সেরা একক সোলো গোল, কিংবা ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের সেই নাটকীয় লাল কার্ড- প্রতিটি অধ্যায়ই বারুদে ঠাসা।

আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ এই ইতিহাসের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, মাঠের বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই লড়াইয়ের পেছনে জড়িয়ে আছে অনেক বেদনা, অনেক ইতিহাস আর অনেক গল্প। কিন্তু আমরা পেশাদার ফুটবলার। আজ যেমন আমরা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে ম্যাচ জিতেছি, বুধবারও সবটুকু উজাড় করে দেব। ছোটবেলা থেকে যখনই ফুটবলে লাথি মেরেছি, তখন থেকেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন দেখেছি। এর চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর কিছু হতে পারে না।
সুইসদের প্রাচীর ভাঙা ম্যানচেস্টার সিটি তারকা হুলিয়ান আলভারেজও কিন্তু ইংল্যান্ডের শক্তি নিয়ে বেশ সতর্ক। তিনি বলেন, বিশ্বের সেরা চার দলের মধ্যে জায়গা করে নিতে পেরে আমরা গর্বিত। আমরা জানি ইংল্যান্ড দলে বেশ কিছু চোখ ধাঁধানো বিশ্বমানের খেলোয়াড় আছে। এই বিশ্বকাপে ওরা দারুণ ফুটবল খেলছে। তবে এখন আমাদের দ্রুত রিকভারি করে নিজেদের রণকৌশল সাজাতে হবে।
বুধবার রাত ১টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে যে দলই জিতবে, তারা আগামী রোববারের ফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন বা ফ্রান্সের। মেসির কেরিয়ারের এই অপূর্ণ বৃত্ত কি আজ পূর্ণ হবে থ্রি-লায়ন্সদের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে, নাকি ইংলিশদের তারুণ্যের জোয়ারে ভেসে যাবে আলবিসেলেস্তেদের ফাইনালের স্বপ্ন? উত্তর দেবে আটলান্টার সবুজ গালিচা!
