চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সাময়িক বিরতি গত মে মাসে শেষ হওয়ার পর থেকেই রণক্ষেত্র আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার ভোরে ইউক্রেন জুড়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম ও ভয়াবহ আকাশসীমা লঙ্ঘন করে হামলা চালিয়েছে পুতিন বাহিনী।
রাশিয়ার এই আকস্মিক মিসাইল ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেন জুড়ে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে দিনিপ্রো শহরে ৯ জন এবং রাজধানী কিভে ৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। হামলায় বেশ কয়েকজন শিশুসহ অন্তত ৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কি মঙ্গলবার সকালে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, গত রাতেই রাশিয়া একযোগে ৬৫৬টি স্ট্রাইক ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক, ক্রুজ ও অ্যান্টি-শিপসহ মোট ৭৩টি বিভিন্ন ঘরানার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। জ়েলেনস্কি বলেন, মূল হামলাটি চালানো হয়েছে রাজধানী কিয়েভে, যেখানে ডজন খানেক আবাসিক ভবন এবং সম্পূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দিনিপ্রো শহরে একটি চার তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের একটি বড় অংশ রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, যেখানে এক শিশুসহ ৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ থাকা আরও ৬ জনের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাজধানী কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় একের পর এক ডজন খানেক বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। ড্রোনের ঘরঘর শব্দের মাঝেই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি পেট্রোল পাম্প, একটি নির্মাণাধীন এলাকা এবং বেশ কয়েকটি বহুতল আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। হামলার পর পরই পুরো রাজধানী বিদ্যুৎহীন (ব্ল্যাকআউট) হয়ে পড়েছে এবং কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢেকে গেছে কিভের আকাশ।
এছাড়া উত্তর-পূর্বের খারকিভ শহরের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে এক শিশুসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণের জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের একটি শিল্প কারখানাতেও রুশ বাহিনী আঘাত হেনেছে।

মস্কোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় এই হামলার দায় স্বীকার করে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পূর্ব ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত একটি শিক্ষার্থী ছাত্রাবাসে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলার জবাবেই এই ‘সিস্টেমেটিক স্ট্রাইক’ বা সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়েছে এবং এর লক্ষ্য সম্পূর্ণ সফল হয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের দাবি, তারা কোনো বেসামরিক ছাত্রাবাসে নয়, বরং রুশ সামরিক ইউনিটে আঘাত করেছিল। মস্কোর এই হামলাকে ইউক্রেন লজ্জাহীন ব্ল্যাকমেইল বলে অভিহিত করেছে।

এই ভয়াবহ সংকটের মাঝে প্রেসিডেন্ট জ়েলেনস্কি আমেরিকার কাছে জরুরি ভিত্তিতে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মিসাইল সরবরাহের জন্য আর্জি জানিয়েছেন। তবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে প্যাট্রিয়ট মিসাইলের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
তার ওপর গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় মার্কিন ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইউক্রেনে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেন। ফলে ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো এখন আমেরিকা থেকে চড়া দামে এই মিসাইল কিনে তারপর কিভকে সাহায্য করছে।

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পর রাশিয়ার এই মারমুখী রূপ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি জেলেনস্কি প্রশাসনকে নতুন করে চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।
