বিশ বছর আগে ২০০২ সালে কোনো অভিযোগ ছাড়াই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র হাতে আটক হয়েছিলেন আবু জুবায়দা। এরপর ২০০৬ সালে গুয়ানতানামো বে কারাগারে বন্দি হওয়ার আগ পর্যন্ত চার বছরে তিনি সিআইএ'র হাতে অকথ্য আর অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন।
কখনও তাকে এক পায়ে দাঁড়িয়ে নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে রাতের পর রাত। কখনও বন্দি করে রাখা হয়েছে আড়াই ফুটের বাক্সে। সিআইএ'র বিভিন্ন গোপন কারাগারে বসে এসব নির্যাতনের বর্ণনা নিজের ডায়রিতে লিপিবদ্ধ করেছেন আবু জুবায়দা।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান তার এসব নোটের কিছু সম্পাদিত অংশ প্রকাশ করেছে। তারই চুম্বক অংশ নিয়ে এই প্রতিবেদন।
আবু জুবায়দার বর্ণনা শুরু হয় এভাবে- 'মুখে পানির ছিটায় ঘুম থেকে উঠে আমি নিজেকে একটি ধাতব খাটে বাঁধা অবস্থায় আবিস্কার করি।...সম্পূর্ণ কালো পোশাকে এক লোক একটি পানির ট্যাঙ্ক নিয়ে আমার কক্ষে প্রবেশ করে। এরপর আমি যখনই ঘুমিয়ে পড়তাম সে আমার চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে দিত। এক সেকেন্ডের জন্যও আমাকে ঘুমাতে দেয়া হতো না।'
'সেলের ভেতরে এতো জোরে জোরে শব্দ করা হতো যে আর কিছুই শোনা যেতো না। এরপর কলম আর নোটপ্যাড হাতে দুইজন লোক এসে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতো। উলঙ্গ অবস্থায় আমি ঠাণ্ডায় কাঁপতে শুরু করলে তারা আমাকে একটি তোয়ালে দিতো আমার বুক ঢাকার জন্য।'

আবু জুবায়দার আঁকা অত্যাচারের চিত্র
পরদিন শুরু হতো নতুন অত্যাচার, লেখেন জুবায়দা। কক্ষের তাপমাত্রা একেবারে কমিয়ে দেয়া হতো। প্রথমে তাকে ঘুমাতে দেয়া হতো না, এরপর একে একে খাবার আর পানি থেকেও তাকে বঞ্চিত করা হতো দিনের পর দিন। টানা তিন-চারদিন একই অবস্থানে বিছানার সাথে বেঁধে রাখার ফলে যখন তিনি আর নড়তেও পারতেন না, তখন তাকে একটু অবস্থান পরিবর্তন করার সুযোগ দেয়া হতো।
বিছানা থেকে মুক্ত করার পর জুবায়দাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে বেঁধে রাখা হতো। এসময় মুত্রত্যাগ করার জন্য তাকে একটি কৌটো দেয়া হয়। প্রায়ই মুত্র তার পায়ে বাঁধা ব্যান্ডেজ পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ত। ওই অবস্থায়ই তাকে না ঘুমিয়ে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হতো। টানা দুই সপ্তাহ না ঘুমানোর পর এমন হতো যে মুখে পানি ছিটিয়ে দিলেও তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন।
'এরপর যখন আমি এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম, তখন তারা আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে শুরু করলো। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ঘুমিয়ে পড়লেই তারা আমাকে উঠিয়ে গুলি খাওয়া পায়ে ভর দিয়ে হাঁটাতো। এভাবে চেয়ারে বসে আমার ছয় সপ্তাহ কাটে।'
বর্ণনার এক পর্যায়ে জুবায়দা লেখেন, 'হাত উপরে তুলে বেঁধে রাখার কারণে এক পর্যায়ে আমার হাত দুটো নীলচে রঙ ধারণ করে। হাত খুলে দেয়ার পর আবারও শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ।'
২০০২ সালের জুন থেকে আগস্টের মাঝে ৪৭ দিনের জন্য সব ধরণের জিজ্ঞাসাবাদ বন্ধ করে আইসোলেশনে রাখা হয় জুবায়দাকে। তাকে অত্যাচারের জন্য সিআইএ যেন কোনো প্রকার বিচারের সম্মুখীন না হয় তা নিশ্চিতের জন্য এই সময়ের মধ্যে মার্কিন বিচার বিভাগের কাছে লবিং করে সিআইএ।
এই ৪৭ দিন শেষ হওয়ার পর জুবায়দাকে একটি কফিনাকৃতির বাক্সের মধ্যে আটকে রাখা হয়। সেখানে তিনি কাটান টানা ২৬৬ ঘণ্টা।
এরপর এক পর্যায়ে কফিনের ভেতর পানি ঢেলে দেয়া হয়। ফুসফুসে পানি ঢুকে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তাকে পানি থেকে তুলে নেয়া হতো। তাকে 'ওয়াটারবোর্ডিং' নামে এই অত্যাচারের কৌশলের শিকার করা হয় অন্তত ৮৩ বার। কোনো কোনদিন তাকে দিনে পাঁচবারও এভাবে পানিতে ডোবানো হতো।
এখানেই শেষ নয়। চার বছরে এ ধরণের অসংখ্য অভিনব আর অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন আবু জুবায়দা। ২০০৬ সালে তাকে গুয়ানতানামো বে কারাগারে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে এখনও বিনা অভিযোগে বন্দি তিনি।
একাত্তর/এসজে
