বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর অধিকার এখনও পিতৃতন্ত্রের করুণা। নারীর অর্জনকে খোলামনে স্বীকৃতি দেয়া হয়না এখানে। এই অভিমত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপার্সন ড. উম্মে বুশরা ফাতেহা সুলতানার।
নারী দিবস উপলক্ষে একাত্তরের জুলিয়া আলমের সঙ্গে তার বিশেষ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নারীর পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মজীবনের নানা দিক।
জুলিয়া: গত দশক থেকেই বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়ন দেখছে বিশ্ব। চলতি একুশ শতকের দুই দশকে এদেশের নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে গুণগত কী পরিবর্তন দেখছেন আপনি?
ড. বুশরা: বাংলাদেশের নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দিকগুলোকে যদি আলাদা করে দেখা হয় তাহলে আমি বলবো, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে ক্ষমতাসম্পন্ন পজিশনগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। গত দুই দশকে অর্থনীতিতে এবং সামাজিক ক্ষেত্রেও এটি আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু ক্ষমতায়নের দিক থেকে যদি বিষয়গুলো দেখা হয় নারীর ক্ষমতায়নের অনেকগুলো নির্দেশক রয়েছে।
প্রথমত ক্ষমতায়ন প্রত্যয়টি বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয় কিন্তু এটি যে তাৎপর্যে ব্যবহার হওয়ার কথা সেটি কিন্তু কম।
অনেকে মনে করেন, নারীর ক্ষমতায়ন মানে হচ্ছে বাহ্যিক দিক থেকে তাকে কেমন দেখা যাচ্ছে, আউটডোর ভিজিবিলিটি কেমন, সেটি ক্ষমতায়নের একটি অংশ কিন্তু ক্ষমতায়নের আরও কিছু নির্দেশক রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে নারী সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কিনা, তার যথাযথ বারগেনিং পাওয়ার আছে কিনা, আইনের ক্ষেত্রে তার কী ধরনের অধিকারগুলো অর্জন হয়েছে। এসব নির্দেশকের আলোকে যদি দেখি তবে বলতে হবে গত দুই দশকে বেশ কিছু জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও প্রকৃতপক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি যখন আসছে তখন কিন্তু নারীর প্রকৃত অংশগ্রহণ- নারীর কথা বা নারীর স্বর কমই উঠে আসছে।
যেমন ধরুন, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ আছে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষের কণ্ঠস্বরই বেশি উঠে আসছে সেখানে। সামাজিক ক্ষেত্রেও তাই। আজও কি পুরুষের মতোই রাত দিন যেকোনো সময় নারীর স্বাভাবিক ও নিরাপদ চলাফেরা দেখতে পাই কিনা এই বিষয়টি কিন্তু বিবেচনায় রাখতে হবে।
ধর্ষণের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এখন ধর্ষণের সাথে আরেকটা প্রপঞ্চ যুক্ত হয়েছে ধর্ষণের শিকার নারীকে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে। আমি বলবো যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু সামগ্রিক চিত্র যদি আমরা বিবেচনায় নেই তাহলে বলতে হবে আমাদের অনেক পথ বাকি আছে এখনও।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে নব্বই দশক থেকেই বুমিং টাইম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, প্রচুর নারী ঘরের বাইরে অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত হচ্ছে। পোশাক রপ্তানি খাতে তো বটেই ইনফরমাল সেক্টরগুলোতেও জিডিপিতে জিএনপিতে নারীর অবদান বাড়ছে। দেশের বাইরেও প্রচুর নারী কাজ করতে যাচ্ছে, তারা আবার দেশের অর্থনীতিতে অংশ নিচ্ছে। তবে তারা যে উপার্জন করছে তা তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটুকু প্রতিফলন ঘটছে সেটাও আমাদের দেখতে হবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের অর্থনীতিতেই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কারণ ফেমিনাইজেশন অব লেবার ফোর্স। নারীকে চিপ সোর্স অফ লেবার, ডোসাইল কমিউনিটি হিসেবে দেখা হয়। তাদের শোষণ করে পুঁজিবাদ কতো বেশি লাভবান হতে পারে। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে কিন্তু দেখা দরকার তার অধিকারগুলো নিশ্চিত হচ্ছে কিনা।
জুলিয়া: গত দুই দশকের প্রায় পুরোটা সময়ই বাংলাদেশের সরকার প্রধান নারী। তাই প্রশাসনের বিভিন্ন ধাপে নারীর পদায়ন চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সমাজের অন্য অনেক ক্ষেত্রে এমনকি কর্পোরেট নেতৃত্বেও নারীরা এখনও অনেক পিছিয়ে। এর কারণ কি?
ড. বুশরা: কর্পোরেট সেক্টর খুবই চ্যালেঞ্জিং। এখানে কম্পিটিশন ছাড়া কিছু নেই। কর্পোরেট নেতৃত্বে কিছু কিছু নারী আমরা দেখেছি। তাদের শক্তিশালী একটা প্রিভিয়াস ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। কিন্তু ওপেন কম্পিটিশনে পুরুষের সাথে আসতে গেলে দেখা যায় কর্পোরেট সেক্টর খুবই প্রতিযোগিতামূলক, মানে আপনি কতো বেশি দিতে পারছেন। সেখানে ৯ থেকে ৫ টা বাঁধাধরা সময় নেই। এক্ষেত্রে নারীর যে চ্যালেঞ্জ সেটি হলো সে গর্ভধারণ করে সে সেবামূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এগুলো পাশাপাশি করে সে যখন কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে সময় দিতে যায় স্বাভাবিকভাবেই কিন্তু সে পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে যায়। একই সময় তার পক্ষে দেয়া সম্ভব হয় না। তাছাড়া আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, আমাদের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো তা নারীকে লিডিং পজিশনে দেখতে প্রস্তুত নয়। এসব কিন্তু নারীর জন্য বড় একটা বাধা তৈরি করে। সে যদি কর্পোরেট নেতৃত্বে যায়ও তাকে সহযোগিতার পরিবেশ প্রস্তুত আছে কিনা সেই চ্যালেঞ্জ আমাদের এখনো রয়ে গেছে।
জুলিয়া: শ্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সফলতার বড় অংশীদার নারী। কিন্তু শিল্পের মালিকানা তো দূরের কথা কারখানার মিড লেভেল ম্যানেজম্যান্টেও নারীর অংশিদারিত্ব এখনও নগণ্য। কোনো ৪৪ বছর বয়সী এই শিল্প এখনো পুরুষতান্ত্রিকই রয়ে গেলো? একজন জেন্ডার এক্সপার্ট হিসেবে এনিয়ে আপনার উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ শুনতে চাই?

ড. বুশরা: পোশাক শিল্পের সাথে নারীর সংশ্লিষ্টতা বেশ দীর্ঘ সময়ের। এখানে নারীর যে অংশগ্রহণ এবং এটা বাড়ছে আমি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখবো। এখানে যাচ্ছেন শ্রমজীবী নারীরা। দেখতে হবে এখানে কিভাবে আরো নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। যে বৈষম্যগুলো রয়েছে তার মজুরি বৈষম্য হচ্ছে, তার যে স্বাভাবিক ছুটিগুলো পাওয়ার কথা অধিকাংশ পোশাক কারখানায় তার কর্মী যদি গর্ভধারণ করে এরকম সংবাদ যদি পাওয়া যায় তাহলে তাকে ছাঁটাই করে দেয়া হচ্ছে ছুটি দেয়ার পরিবর্তে। সেখানে কাজগুলো হচ্ছে চ্যালেঞ্জিং। দেখা যায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করতে হয়, তাদের বিরতির সময় কম। পোশাক শিল্পের সাথে নারীর অন্তর্ভুক্তি আমরা নেগেটেভলি দেখবো না কিন্তু আমাদের দেখতে হবে তাদের অধিকারগুলো আরো দৃঢ়ভাবে যেন আদায় করে নিতে পারি। ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংঘের নেতৃত্বে নারীরা থাকছে কি না। ওভারটাইমের ক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। ক্ষমতায়নের কথা যদি বলি তবে বেতনের কতটুকু অংশ সে ব্যক্তিগত কাজে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ব্যবহার করতে পারছে এই বিষয়টাও দেখতে হবে। পোশাক শিল্পে প্রচুর অংশ নিয়ে তারা অনেক অবদান রাখছে অর্থনীতিতে। সুতরাং এখানে রাষ্ট্রের একটা দায় থেকে যায়। তাদের অধিকারগুলো সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে কিনা।
আরেকটা বিষয় নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য খুবই অবহেলিত থাকে, যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রচুর ঘটে। এমন ঘটনার অভিযোগ করার জায়গা থাকে, কোথাও কোথাও অভিযোগের পর কি হলো সেই খোঁজও কিন্তু আমরা কেউ রাখি না। আমি একেবারে ঢালাওভাবে বলবো না যে সব কারখানায় এমন হয় তবে বড় চিন্তার জায়গাটা হলো তারা অবহেলিত থাকে সেই বিষয় গুলোয় আরো নজর দেয়া দরকার উন্নত করা দরকার।
জুলিয়া: তথ্য সমুদ্রে ভেসে থাকার যুগ এটি। সোশ্যাল মিডিয়া এখন জীবন ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কিন্তু রুচিহীনদের চাহিদায় নারী এখানে ভাইরাল এলিম্যান্ট হয়ে যাচ্ছেন, পুরুষের কু-রিপুর ভুক্তভোগী হচ্ছেন; এই বিষয়গুলোকে আপনি কিভাবে দেখেন?
ড. বুশরা: এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় প্রশ্ন করলেন আপনি । দেখুন অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা বলছি এখন কিন্তু পোশাক শিল্পের পাশাপাশি নতুন ডাইমেনশন হচ্ছে প্রচুর নারী স্বল্প শিক্ষিত, শিক্ষিত এবং উচ্চ শিক্ষিত নারীরাও এন্টারপ্রেনিয়ার হচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বিভিন্ন ধরনের স্যোশাল মিডিয়ায় তারা স্বল্প পুঁজি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এখানে তারা নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন লাইভে তারা যখন তাদের প্রোডাক্টস শো করতে চান নানা ধরনের বুলিং এর শিকার হন।
আমাদের এখানে সাইবার আইন আছে, সাইবার ইউনিটও আছে কিন্তু এগুলো কিভাবে আরো বেশি কার্যকর করা যায় তা দেখতে হবে। গণমাধ্যম এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। নারীরা সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন তারা অভিযোগ করলে এটা যথার্থভাবে দেখা হয় এবং শাস্তি হয় এই বিষয়গুলো যদি সামনে নিয়ে আসা যায় তাহলে নারীরা অনেক বেশি অভিযোগ নিয়ে এগিয়ে আসবে। আমি বলতে চাই শাস্তি ছাড়া কোনো অন্যায়কে মিনিমাইজ করা যায় না। আর আমাদের সাইবার ল’ আরো কঠিন করতে হবে।
জুলিয়া: মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টে মেয়েরা এখন অনেকে এগিয়ে থাকে। কিন্তু প্রায়োগিক বিজ্ঞান ও অগ্রসর পেশার শিক্ষাসহ উচ্চশিক্ষায় নারীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে কম। এর কারণ কী কী?
ড. বুশরা: আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় ধরে নারীদেরকে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট করা হতো না। নারী শিক্ষার দরকার নেই কারণ ইন্ড অফ দ্যা ডে তারা অন্য ফ্যামিলিতে যাচ্ছে। তারা অন্য একটি সংসার গড়ে তুলবে। অন্যকে সার্ভ করবে। এরকম চিন্তা থেকে কিন্তু নারীকে দীর্ঘদিন শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়নি। এখন এটা অত্যন্ত ইতিবাচক যে মেয়েরা শিক্ষা নিচ্ছে, মেয়েরা উচ্চ মাধ্যমিকে, মাধ্যমিকে ছেলেদের সাথে কম্পিটিশনে অনেক ভালো করছে। এগুলো কিন্তু স্বাভাবিক সময়ের উদাহরণ। আমরা দেখবো ক্রাইসিস সময়ে কি হচ্ছে। এখন আমরা একটা প্যানডামিকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি; দুই বছর হলো করোনা মহামারি শুরু হয়েছে। এই সময়ে কি ছেলেমেয়ে এডুকেশনে সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। বিজ্ঞানের দিক থেকে প্রযুক্তির দিক থেকে একটা অবহেলা আছে। প্যানডামিকের মতো ক্রাইসিসে বিশেষ করে গ্রামের প্রচুর সংখ্যক মেয়ে ঝরে যায়, বাল্যবিবাহ হয়।
এখনো সায়েন্স, ম্যাথমেটিক্স এখানে ছেলেদেরকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। আমাদের মনোভাব আমাদের চিন্তা কাঠামোতে একটি পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড আছে, ম্যাথ অলিম্পিয়াড আছে তারা ইতিবাচক হিসেবে যতো বেশি মিডিয়াতে আসবে ততো বেশি চিন্তাধারার পরিবর্তন হবে। ছেলেমেয়ে বিষয় নয় কে বেশি স্কিল অর্জন করতে পারছে সেটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি ফোকাসড হওয়া উচিত।

জুলিয়া: বৈষম্যের শিকার হওয়া এবং পিছিয়ে থাকার জন্য নারীরও নিশ্চয়ই কিছু দায় আছে। আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশি নারীর দায়গুলো কী কী? কোথায় কোথায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে, সচেতন হতে হবে এবং সক্রিয় হতে হবে?
ড. বুশরা: দক্ষিণ এশিয়ার যে কয়েকটি দেশ রয়েছে সবগুলোই এখনো প্রচণ্ড রকম পিতৃতান্ত্রিক। বাংলাদেশেও একই অবস্থাই বিরাজ করছে। নারীরা সর্বত্র পিতৃতান্ত্রিকতা দ্বারা আক্রান্ত। একটি পরিবারে যখন ছেলে শিশুটি খাবারের ক্ষেত্রে শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারে সম্পদ ভাগ বণ্টন হয় মা-বাবা উভয়ের দ্বারা কিন্তু খাবার বণ্টন কিন্তু মায়ের হাতেই থাকে। আমাদের মায়েদের এখনও কেন জানি মনে হয় একটা মেয়ের পুষ্টি যতোটুকু দরকার তার চেয়ে ছেলে শিশুর পুষ্টি বেশি দরকার। আমাদের মেয়েদেরও কিন্তু সেই চিন্তাপ্রক্রিয়া পরিবর্তন করতেই হবে। যিনি মা তিনি কিন্তু তার বিষয়ে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেন। সবাই খাওয়ার পর তিনি খান। পরিবারের সবাইকে ভাল জিনিষগুলো দিয়ে যা থাকে তা তিনি নেন। যেই মা এটি করেন না তাকে কিন্তু সমাজে নারী পুরুষ উভয়ে আবার নানাভাবে কটূক্তি করে, সমালোচনা করেন।
একটা অর্গানাইজেশনের কথা যদি আপনি চিন্তা করেন সেখানে পুরুষকর্মী আছে, নারীকর্মী আছে নারীরা কি তাদের যোগ্যতায় এগিয়ে যেতে পারেন যেভাবে পুরুষ এগিয়ে যায়। কিন্তু নারী যদি একটু পদন্নোতি পান, একটু সুযোগ পান, তখন কিন্তু দেখা যায় নারী সহকর্মীরাই নানাভাবে তার ত্রুটিগুলো বের করে আনার চেষ্টা করেন তারা বলতে থাকেন নারী তার যোগ্যতার জন্য সুযোগটি পাননি। বরং তার সৌন্দর্য, তার নারী বৈশিষ্ট্যের কারণে, নারী পরিচয়ের কারণেই সুযোগ পেয়েছেন। আসলে নারী পুরুষ যতোটা না তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আমাদের মনোকাঠামো। আমাদের মনোকাঠামো দশকের পর দশক ধরে পিতৃতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা দ্বারা এতো বেশি ইউজড টু হয়ে গেছে এতো বেশি অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে আমরা নারীরাও কিন্তু সেই পক্ষপাত দুষ্ট ব্যবহারগুলোকে ধরে রাখি। আমরা লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত পুনরুৎপাদিত করি।
জুলিয়া: অর্থনীতির মাপকাঠিতে আগামী ১৯ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ হবে উন্নত দেশে। সে সময় এদেশের নারীদের আপনি কোথায় দেখতে পান, কোথায় দেখতে চান?
ড. বুশরা: আমি আশাবাদী বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে চলে যাবে। কিন্তু উন্নত দেশে নারী ও পুরুষ যেভাবে হাতে হাত রেখে পাশাপাশি অগ্রসর হচ্ছেন সেই চিন্তাটার সাথে আমাদের ইউজ টু হতে হবে। উচ্চ শিক্ষার জন্য কর্মের জন্য অনেকগুলো উন্নত দেশে আমার যাওয়া হয়েছে। পশ্চিমা দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা, চাকরি ব্যবস্থা আমি দেখেছি সেখানে সবচেয়ে বেশি যেটি গুরুত্ব পায় সেটি হলো নারী পুরুষের চলাচলের স্বাধীনতা আছে কিনা, সহিংসতার শিকার হচ্ছে কিনা। আমি বলবো না যে পৃথিবীতে অন্য সব দেশ সহিংসতামুক্ত কিন্তু দেশগুলোতে সহিংসতাকে যতোটা গুরুত্ব সহকারে নেয়া হচ্ছে একজন নারী সহিংসতার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য পাচ্ছেন কোথাও গিয়ে অ্যাপ্রোচ করতে পারছেন আমাদের দেশেও কিন্তু সেই পরিবেশ অর্জনের দিকে যেতে হবে। আপনার যদি গতিবিধিতে স্বাধীনতা না থাকে তাকে সবসময় নির্দিষ্ট একটা টাইমের মধ্যে তার কাজ শেষ করতে হয় নিরাপদ জায়গায় ফেরত আসতে হয় এই প্রতিবন্ধকতাটা যদি আপনার মিনিমাইজ না হয় সমাধান না হয় তাহলে কিন্তু আমরা পিছিয়ে থাকবো, আমাদের অর্জন পিছিয়ে যাবে। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র, আইনকাঠামো এবং অনেক ভাল ভাল আইন আছে আমাদের বাস্তবায়ন হয়না। সম্পত্তির যে আইন সেখানে এখনো পক্ষপাতদুষ্টতা রয়ে গেছে সেগুলো দূর হবে আশা করছি। এখনো ছেলে শিশুর পাশাপাশি মেয়ে শিশু পেলে অনেক অভিভাবকের মনে হয় তার ভবিষ্যৎ কি তাকে তো বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জমাতে হবে তার শিক্ষার জন্য না এই মনোভাব থেকে আমাদের বের হয়ে আসবো। এখনো ভ্রূণে একটা কন্যা সন্তান থাকলেই হতাশা চলে আসে এগুলো আমরা দূর করবো।
কর্পোরেট সেক্টরে অবশ্যই নারী নেতৃত্বের দরকার আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে আরো বেশি নারীর অংশগ্রহণ দরকার। প্রশাসনে এখনো পুরুষের প্রাধান্য অনেক বেশি। যতদিন না পর্যন্ত সেখানে মোটামুটি ধরনেরও সমতা না আসে ততোদিন গ্রহণ ও বারগেনিংয়ে সমতা রিফ্লেকটেড হবে না।
আজ থেকে ১৯ বছর পরের সেই সময়ে গেলে আমি চাই লিঙ্গ নয় নারী, পুরুষ, থার্ড জেন্ডার বা হিজড়া যাই বলি না কেনো সে লিঙ্গ নয় বরং মেধা, যোগ্যতা, স্কিল প্রাধান্য পাবে বলে আমি আশা রাখছি।
জুলিয়া: শুধু নারী দিবস উপলক্ষে নয়, সমজের চলমান বাস্তবতা মাথায় রেখে একটি প্রকৃত অগ্রসর ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে বাংলাদেশের পুরুষদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি৷ তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?
ড. বুশরা: জেন্ডার, সচেতনতা যেনো শুধু দিবস কেন্দ্রিক না হয়। কারণ শিক্ষা, চাকরি ক্ষেত্রে পরিবারেও নানাভাবে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয় নারী। যৌতুক থেকে শুরু করে এসিড ভায়োলেন্স, এগুলো আসলে পুরো বছরজুড়েই সচেতনতা চর্চা করতে হবে। নারী দিবসকে আমরা একটা টারগেট হিসেবে দেখতে পারি’ এই ৮ মার্চ থেকে পরের বছরের ৮ মার্চ কি অর্জন হলো। বিগত বছরে আমাদের কি কি ত্রুটিগুলো ছিলো কি কি ঘাটতি ছিল আমাদের আইন বাস্তবায়নের দিকে। আমাদের অনেক ভাল ভাল আইন আছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থেকে শুরু করে এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, পারিবারিক নির্যাতন দমন আইনও আছে সেগুলো আমরা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারছি। বিগত বছরে একটা ঘটনা ঘটে গেল বিয়ের ক্ষেত্রে কাজী হবার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বললো যে মেয়েরা কাজী হতে পারবে না কারণ তাদের মেনুস্ট্রেশন হয়। আমরা এতো এগিয়ে যাচ্ছি এতো ভাল ভাল কথা বলছি এত অর্জনের কথা বলছি মেনুস্ট্রেশন একটা দৈহিক প্রক্রিয়া মানুষের পরবর্তী প্রজন্ম তৈরির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রক্রিয়া। এটাকে কেনো আমরা যোগ্যতার ক্ষেত্রে বাঁধা হিসেবে দেখবো! এত রুটে যে আমাদের পক্ষপাতদুষ্টতা রয়েছে সেগুলো কিন্তু অনেক বেশি প্রাচীন অনেক বেশি গভীরে পতিত। সেগুলো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সেনসেটাইজ করার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার এটার বিকল্প কিছু আছে বলে মনে করি না।
জুলিয়া: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. বুশরাঃ আপনাকেও ধন্যবাদ। একাত্তর পরিবার ও দর্শকদেরও ধন্যবাদ।
একাত্তর/এসি
