নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সময় 'প্রযুক্তিগত ত্রুটি'র কারণে দুর্ঘটনাবশত পাকিস্তানের দিকে মিসাইল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে বলে জানালেও এটি কি ধরণের মিসাইল ছিলো সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি ভারতের কর্তৃপক্ষ।
তবে বুধবার (৯ মার্চ) পাকিস্তানের দিকে নিক্ষেপিত মিসাইলটি 'ব্রাহমোস' ছিলো বলে ধারণা করছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, জানিয়েছে বিবিসি।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, পাকিস্তানের পূর্ববর্তী মিয়া চান্নু শহরে একটি 'উচ্চ গতিসম্পন্ন উড়ন্ত বস্তু' ধ্বংস হয়েছে এবং ঐ উড়ন্ত বস্তুর গতিপথের নিকটবর্তী যাত্রীবাহী বিমানের চলাচল ব্যহত করেছে।
আর ভারত জানিয়েছে, দুর্ঘটনাবশত পাকিস্তানের দিকে একটি মিসাইল নিক্ষেপ করেছে তারা। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সময় 'প্রযুক্তিগত ত্রুটি'র কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দিল্লি এই ঘটনায় 'গভীর অনুশোচনা' প্রকাশ করেছে এবং দুর্ঘটনায় কেউ নিহত না হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
ভারত সরকার ইতিমধ্যে এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং এই ঘটনায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের আদেশ দিয়েছে।
এদিকে, এই ধরণের 'অবহেলার অপ্রীতিকর পরিণতি'র বিষয়ে সতর্ক থাকা, এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে বিষয়ে দিল্লিকে সতর্ক করেছে ইসলামাবাদ। তারা বলছে, মিসাইলটি হরিয়ানা রাজ্যের সিরসা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
পাকিস্তানের বিমানবাহিনী জানায়, মিসাইলটি পতনের আগে পাকিস্তানের আকাশসীমায় শব্দের গতির তিনগুণ গতিতে ১২ হাজার মিটার (৪০ হাজার ফিট) উচ্চতা দিয়ে ১২৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে।
এই বিষয়ের বিস্তারিত গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরার সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ শাখার মেজর বাবর ইফতেখার বলেন, ৯ মার্চ সন্ধ্যা ৬:৪৩টায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এয়ার ডিফেন্স অপারেশন সেন্টার ভারতীয় আকাশসীমার ভেতরে উচ্চ গতিসম্পন্ন মিসাইল সদৃশ একটি বস্তুর উড্ডয়ন পর্যবেক্ষণ করে।
প্রাথমিক উড্ডয়নের পর উড়ন্ত বস্তু হঠাৎ পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং ৬:৫oটায় মিয়া চান্নুর কাছে পতিত হয় বলে জানান তিনি।
কোন ধরণের মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করে না বলা গেলেও ধারণা করা হচ্ছে এটি একটি 'ব্রাহমোস' সুপারসনিক মিসাইল।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে 'ব্রাহমোস' মিসাইলের উল্লেখ না করলেও ভারতের সেনাবাহিনীর তিনটি বিভাগই যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে এই ধরণের মিসাইল ব্যবহার করে থাকে।
ব্রাহমোস শব্দটি ব্রহ্মপুত্র ও মসকভ, দুটি শব্দ যোগ করে তৈরি।
ভারতের ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ও রাশিয়ার মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনসোর্টিয়াম এনপিও'র যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া ব্রাহমোস এরোস্পেসের তৈরি মিসাইল ব্রাহমোস।
আরও পড়ুন: নরওয়ে যাচ্ছে ন্যাটো সেনারা
ব্রাহমোস মিসাইলের সর্বোচ্চ গতিবেগ ২.৮ 'ম্যাক' (ঘণ্টায় প্রায় ৩,৪৫০ কিলোমিটার বা ২,১৪৮ মাইল/ঘণ্টা)। অ্যান্টি মিসাইল সিস্টেম দিয়েও এটিকে থামানো কঠিন।
বিভিন্ন ধরণের রাডারকে ফাঁকি দিতেও সক্ষম এই মিসাইল।
ভূপৃষ্ঠের ১৫ কিলোমিটার ওপর দিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে এই মিসাইলটির। এর ২০০ থেকে ৩০০ কেজি পরিমাণ বিস্ফোরক বহন করার সক্ষমতা রয়েছে।

ব্রাহমোস মিসাইলটির সাথে একটি ইঞ্জিন রয়েছে, যেটি জ্বালানি বহন করতে পারে।
মিসাইল নিক্ষেপের প্রথম ধাপে এই ইঞ্জিন অতি উচ্চ গতিতে (শব্দের চেয়ে দ্রুত গতি) মিসাইলটি বহন করে নিয়ে যায় এবং ইঞ্জিন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এর 'র্যামজেট' প্রযুক্তি (বিমান উড্ডয়নের এক ধরণের পদ্ধতি) কার্যকর হয়।
তারপর মিসাইলটির গতি বৃদ্ধি পায় এবং 'ম্যাক থ্রি' বা শব্দের তিনগুন গতিবেগ অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছায়। এই ধরণের মিসাইলের গতিপথ শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা যায় না।
ব্রাহমোস মিসাইল মাটি, সাগর ও বিমান থেকে নিক্ষেপ করা যায়।
ভারতের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ব্রাহমোস বিশ্বের একমাত্র মিসাইল যেটি শব্দের গতির তিনগুণ গতিসম্পন্ন।
প্রাথমিকভাবে এটির রেঞ্জ ছিল ২৯০ কিলোমিটার, যেটিকে ৪০০ কিলোমিটারে উন্নীত করতে চায় ভারত।
কতগুলো ব্রাহমোস মিসাইল ভারত তৈরি করেছে, সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলেও চীনভিত্তিক একটি সংস্থার অনুমান ইতোমধ্যে ১৫ হাজারের বেশি ব্রাহমোস মিসাইল তৈরি করেছে তারা।
একাত্তর/জো
