জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় নিজের কোনো দায় নেই বলে দাবি করেছেন দ্বীন ইসলাম। একাত্তর টিভিকে এক সাক্ষাৎকারে এমন দাবি করেন তিনি।
দ্বীন ইসলাম বলেন, অফিশিয়ালি যে দায়িত্ব পেয়েছিলেন, সে অনুযায়ী তা পালন করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি প্রায় দেড় বছর আগের। ২০২২ সালের আগস্টে অবন্তিকার ব্যাচমেটরা কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল ফেসবুকে কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে তাদের নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছিল। জিডি করার সময় অবন্তিকাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ তখন উচ্চতর তদন্তের আশ্বাস দিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গুজব ছড়ানো আইডির পরিচালককে ধরার আশ্বাস দেয়। পরে থানা থেকে বেরিয়ে অবন্তিকা একাধিক ফেসবুক আইডি খুলে গুজব ছড়ায় বলে জানায়। এর জন্য সে দুঃখ প্রকাশ করে। পরে এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা প্রক্টর অফিসে এসে অবন্তিকার বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ৮ আগস্ট লিখিত অভিযোগ দেয়।
দ্বীন ইসলাম আরও বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রক্টর মোস্তফা কামাল আমাকে (দ্বীন ইসলাম) এবং সহকারী প্রক্টর গৌতম কুমার সাহাকে (গণিত বিভাগ) ২০২২ সালের ১১ আগস্ট তদন্তের দায়িত্ব দেন। পরবর্তী সময়ে গত ১৬ আগস্ট, ২০২২ সালে প্রক্টর স্যারের উপস্থিতিতে আমি এবং সহকারী প্রক্টর গৌতম কুমার সাহা অবন্তিকা এবং তার অভিভাবকদের প্রক্টর অফিসে আসার জন্য আহ্বান করি। পরে অবন্তিকার মা মিটিংয়ে আসেন এবং এই সময় সেখানে অবন্তিকার ক্লাসমেটসহ (অভিযোগকারীরা) সবাই উপস্থিত ছিল।
সে সময় অবন্তিকার মা তার ব্যাচমেট (যারা এ অভিযোগ করেছে) তাদের কাছে ঘটনার শুনে বলেন, আমার মেয়ে যা করেছে ভুল করেছে। তিনি ঐ ঘটনার জন্য অভিযোগকারী সবার কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে তার মেয়ে আর এই ধরনের কাজ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
বিষয়টি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য অবন্তিকার মা অনুরোধ জানান এবং বলেন, আমার মেয়ে ভালো শিক্ষার্থী কিন্তু সে কয়েকদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ এবং ওষুধ খাচ্ছে। তখন তার ব্যাচমেটরা বিষয়টা মানবিক এবং ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। এভাবে বিষয়টা প্রাথমিকভাবে মীমাংসা করা হয়। মীমাংসার পর অবন্তিকার মা জিডি তুলে নেয়ার জন্য অভিযোগকারীদের অনুরোধ করেন। কিন্তু অভিযোগকারীরা জিডি তুলে নিতে অসম্মতি জানায়, কারণ তাদের ধারণা অবন্তিকা ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ আবারও করতে পারে।
সহকারী প্রক্টর হিসেবে জিডি তোলার বিষয়ে কিছু করার ছিল না জানিয়ে দ্বীন ইসলাম আরও বলেন, আমরা শুধু প্রতিবেদন দেয়ার অধিকার রাখি। অবন্তিকা ও তার পরিবারের সদস্যদের আমি এ বিষয়ে জানিয়ে প্রক্টর স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করারও পরামর্শ দেই। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও অনুরোধ জানাই বিষয়টি মীমাংসা করতে।
তিনি বলেন, সেই সময় অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা জানান, তারা অবন্তিকাকে আগামী ৩ মাস পর্যবেক্ষণ করবে এবং যদি সে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তাহলে জিডি তুলে নেয়া হবে।
অভিযোগ নিষ্পত্তির ৩ মাসেরও কিছুদিন পর অবন্তিকা এবং তার বাবা-মা প্রক্টর অফিসে জিডি তোলার জন্য আসেন, কিন্তু তার ব্যাচমেটরা জিডি তুলতে অসম্মতি জানায়।
তখন অবন্তিকার মা-বাবা এবং অবন্তিকা আবার আমাকে ফোন করে আমার বিভাগে দেখা করতে আসেন। তখন তারা জিডি তোলার বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করেন। আমি তখন তাদের বিষয়টা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি যে বিষয়টা আমার হাতে নেই। আমাদের কাজ তদন্ত করে রিপোর্ট প্রদান করা এবং আমরা তাই করি। জিডির বিষয়ে প্রক্টর স্যার এবং অভিযোগকারীদের সঙ্গে আলাপ করে নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দেই।
দ্বীন ইসলাম বলেন, প্রক্টর অফিসে অবন্তিকা এবং তার মাকে একবারই ডাকা হয়েছিল। সেই সময় প্রক্টর মোস্তফা কামাল, সহকারী প্রক্টর গৌতম সাহা এবং অভিযোগকারী ও তার বন্ধুরা উপস্থিত ছিলেন। আমি অবন্তিকাকে একাধিকবার ডেকে হেনস্তা করেছি এই বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। কারণ, বিষয়টি ওইদিনই মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল। সুইসাইড নোটে প্রক্টর অফিসে আম্মানের বিরুদ্ধে আনীত যৌন হয়রানি ও ভয়ভীতির অভিযোগের বিচার না পাওয়ার বিষয়টি তৎকালীন প্রক্টর মোস্তফা কামাল ভালো বলতে পারবেন। এ অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবগত নই।
শিক্ষক দ্বীন ইসলাম এই সময় দাবী করেন, এই ঘটনার তদন্ত করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ে একশ'র উপরে সিসিটিভি আছে, আমি অবন্তিকাকে সাতবার ডাকলে তার ফুটেজ থাকবে, আমার বা অবন্তিকার ফোনে ফোন কল থাকবে, অন্য কাউকে দিয়ে ডাকালে ফুটেজ বা ফোনকল পাওয়া যাবে। এর কোনটিই নেই।
বিষয়টির অধিকতর তদন্ত দাবী করে সেই শিক্ষক আরও বলেন, এই ঘটনায় আমার যদি দোষ পাওয়া যায় তাহলে কেবল পুলিশের কাছে নয় আমাকে ছাত্রদের হাতে তুলে দিলেও সমস্যা নেই। আমি আমার এগারো বছরের শিক্ষকতার জীবনে অসংখ্য ছাত্রদের সাহায্য করছি। আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হচ্ছে।
এদিকে শনিবার সন্ধায়্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এরপর রাতে আটক করা হয় অবন্তিকার সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকীকেও।
ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে এই দুইজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। তারা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার রাতে কুমিল্লায় নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা। তার কিছু সময় আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন তিনি, সেখানে সহপাঠী আম্মান সিদ্দিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দীন ইসলামকে দায়ী করে যান নিজের মৃত্যুর জন্য।

এ ঘটনায় শনিবার বিকেলে অবন্তিকার মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারসহ ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
দাবি পূরণ না হলে সোমবার বেলা ১১টায় উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা ফাইরুজ অবন্তিকার মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেও উল্লেখ করেন।
চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উপাচার্যের নির্দেশে অভিযুক্ত সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে অব্যাহতি ও অভিযুক্ত শিক্ষার্থী আম্মানকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে।
অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষকের পর সহপাঠী আটক
