ইসরাইল-লেবানন সর্বাত্মক যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে, এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সবখানে। যুদ্ধ যদি বেধেই যায়, তাহলে কোন দিকে মোড় নেবে বিশ্ব রাজনীতি, আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের অবস্থানই বা কি হবে, এমন সব প্রশ্নের উত্তরও খোঁজা হচ্ছে। যুদ্ধে কি জিতবে, কে হারবে- উত্তরহীন এমন প্রশ্নও উঠছে।
গাজা উপত্যকায় গত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে নির্মূলের কথা বলে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। নির্মূল তো দূরের কথা, হামাসের টিকিও ছুঁতে পারেনি ইহুদিবাদী দখলদার বাহিনী। উল্টো এখন পালানোর পথ খুঁজতে শুরু করেছে।

কিন্তু নিরীহ নারী-শিশুকে হত্যা ছাড়া বাঁচতে পারে না ইসরাইল, বিশেষ করে দেশটির খুনে নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, গাজায় ধ্বংসলীলা প্রায় শেষ, এরপরই লেবাননকে ধুলোয় মেশানো হবে। তার এই হুমকির পর ইসরাইলকে মানচিত্র থেকে মুছে দেয়ার পাল্টা হুমকি দিয়েছেন হিজবুল্লাহ প্রধান।
পাল্টাপাল্টি হুমকিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ-বাতাস। এ পরিস্থিতিতে লেবানন-ইসরাইল যদি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি কি হবে পারে, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষনধর্মী একটি লিখেছেন আরব বিশ্বের প্রখ্যাত রাজনৈতিক ভাষ্যকার আব্দুল বারি আতওয়ান।
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রাই আল-ইয়াওমের জন্য লেখা প্রতিবেদনে আতওয়ান বলেছেন, ইসরাইল লেবাননের বিরুদ্ধে কোনো রকম কাপুরুষতা দেখানোর চেষ্টা করলে হিজবুল্লাহ তার দাঁতভাঙা জবাব দেবে। হিজবুল্লাহ বাহিনীকে বুঝতে হলে সবার আগে পূর্ণাঙ্গ আরব ইতিহাসকে আতস্ত কনতে হবে ইসরাইলকে।

তিনি বলেন, হিজবুল্লাহর ‘হুদহুদ’ ড্রোন ইসরাইলের জন্য এক নতুন বিস্ময়। ইসরাইলি গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামরিক বিশেষজ্ঞরা হিজবুল্লাহর হাতে থাকা লাখো ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রকেটের কথা উল্লেখ করে সংশয় জানিয়েছেন যে, এসব সমরাস্ত্রের মোকাবিলায় ইসরাইল সব দিয়ে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
বিশেষ করে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে তাদের বিস্ময়কর ‘হুদহুদ’ গোয়েন্দা ড্রোন পাঠানোর পর, ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হুদহুদ ড্রোনটি ইসরাইলের সেই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে হাইফা বিমান ও নৌঘাঁটিসহ স্পর্শকাতর সব ছবি তুলে লেবাননে ফিরে গেছে।
ইসরাইল ধ্বংসের পথে- মার্কিন সাংবাদিক থমাস ফ্রাইডম্যানের এমন কথা স্মরণ করিয়ে আতওয়ান বলেন, ইসরাইলকে এখন গাজা, লেবানন ও পশ্চিম তীর- এই তিন ফ্রন্টে যুদ্ধ করছে। যে ইসরাইলকে বিশ্ব এতদিন চিনতো, তা পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ইসরাইল নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই ডেকে আনছে।

এই ইসরাইল এখন ইরান নামক একটি বড় শক্তির মুখোমুখি, যারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতাগুলো ব্যবহার করে ইসরাইলকে ধ্বংস করে দিতে চায়। আর নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াতে চান। তবে এই যুদ্ধে মূলত লাভের ফসল ঘরে তুলবে রাশিয়া ও চীন।
সাইপ্রাস-ইসরাইল গোপন চুক্তিও এখন হিজবুল্লাহ’র হাতে। তবে, এরিমধ্যে দৃশ্যপট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে সাইপ্রাস। ইসরাইল যদি সত্যিই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে তাহলে আমেরিকা চুপ করে বসে থাকবে না। আর আমেরিকা পা বাড়ালেই রাশিয়া ও চীন নিশ্চিতভাবেই বাইরে থেকে হিজবুল্লাহ সমর্থন দেবে।
আতওয়ান বলেন, হুদহুদ শুধু গোয়েন্দা ড্রোন-ই নয়, এর হামলা চালানোর শক্তি রয়েছে। ইসরাইল গত ১০ বছর ধরে হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির ওপর গভীর নজর রেখে আসলেও হুদহুদ ড্রোনের সক্ষমতা দেখে তারা হকচকিয়ে গেছেন। তারা বুঝতে পেরেছে, হুদহুদ দ্রুতগতির এবং রাডার ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে পারে।
আত্মিক মনোবল ও সামরিক শক্তির দিক দিয়ে হিজবুল্লাহ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এ কারণেই সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি লেবানন সফরে গিয়ে খালি হাতে ওয়াশিংটনে ফিরে গেছেন। হিজবুল্লাহকে টলাতে পারেনি তাদের অবস্থান থেকে।
এই আরব বিশ্লেষক ইসরাইলের যুদ্ধমন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের হুমকির প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছেন, তার মতো কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহকে বেশ কয়েকবার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু তার যদি সে রকম কোনো ক্ষমতা থাকত, তাহলে তিনি হয় তা বাস্তবায়ন করতেন, অথবা চুপ থাকতেন; ফাঁকা আওয়াজ দিতেন না।
সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ইসরাইল-লেবানন