লেবাননের সাথে ইসরাইলের সংঘাতময় সম্পর্ক- নতুন কিছু নয়। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে, এই দুই দেশের মধ্যে বিরাজ করছে সাপে নেউলে সম্পর্ক। লেবানন-ইসরাইল সংঘাতের সঙ্গে রয়েছে যোগসূত্র রয়েছে ফিলিস্তিন সংকটের। কারণ ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের শুরু থেকেই সোচ্চার দেশটি।
‘নাকবা’ আরবি শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘বিপর্যয়’। ফিলিস্তিনে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে তারিখটিকে বলা হয় ‘নাকবা’ বা বিপর্যয়ের দিন। এই দিনে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্মের পরপরই সেখান থেকে উচ্ছেদ হতে থাকে ফিলিস্তিনিরা। একটু একটু করে নিজেদের ভূমি হারাতে শুরু করেন তারা।
প্রায় সাড়ে সাত লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও আশপাশের দেশে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সে সময় প্রায় এক লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী লেবাননে আশ্রয় নিয়েছিল। নিজেদের সীমান্ত খুলে দিয়ে তাদেরকে বুকে টেনে নিয়েছিলো লেবাননের সরকার।

ইসরাইল রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণার পরদিনই দেশটিতে আক্রমণ করে মিশর, জর্ডান, ইরাক, সিরিয়া এবং লেবাননের বাহিনী। সেই থেকে লেবাননের সাথে ইসরাইলের শত্রুতার সম্পর্ক চিরস্থায়ী রূপ নিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে লেবানন এবং ইসরাইলের মধ্যে শত্রুতা বয়ে চলেছে।
গত ৭৫ বছরে ইসরাইল অন্তত তিনবার লেবানন আক্রমণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরণের হামলা হয় ১৯৮২ সালে। তখন চল্লিশ হাজার ইসরাইলি সৈন্য, শত-শত ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান লেবাননের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এছাড়া ইসরাইলের নৌ এবং বিমান বাহিনীও এই আক্রমণে যোগ দেয়।

মূলত ফিলিস্তিনে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী শিবির থেকে ইসরাইলকে প্রতিহত করতে গড়ে ওঠা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনসহ বেশ কিছু সশস্ত্র গেরিলা গোষ্ঠীর সঙ্গে ইসরাইলি বাহিনীর আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের জবাবে ইসরাইল এই অভিযান চালায়।
তবে, লেবাননে কিভাবে ফিলিস্তিনি গেরিলা গোষ্ঠী গড়ে উঠলো তা বুঝতে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে কিছুটা পেছনে। ১৯৬৭ সালে মিশর, সিরিয়া এবং জর্ডানের বিরুদ্ধে আগাম হামলা চালায় ইসরাইল। মাত্র ছয়দিনের যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হয়। খেসারত হিসাবে বড় এলাকা হারাতে হয় দেশগুলোকে।

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং মিশরের সিনাই উপত্যকা দখল করে ইসরাইল। এই ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ লেবাননে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত বিশাল সংখ্যক শরণার্থীকে জায়গা দিতে গড়ে ওঠা শরণার্থী শিবির থেকেই দেশটিকে স্বাধীন করতে গড়ে ওঠে কিছু সশস্ত্র গেরিলা গোষ্ঠী। তারা লেবাননকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

এরমধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিলো- প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলও। লেবানন থেকে এই সংগঠনটির বেশ কিছু গেরিলা হামলা চালায় ইসরাইলে। এসব হামলার কারণে ১৯৮২ সালে ইসরাইল পূর্ণ শক্তি নিয়ে লেবাননে আক্রমণ করে বসে।
ইসরাইলের এই আক্রমণের উদ্দেশ্যেই ছিলো বৈরুত কেন্দ্রিক প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে ধ্বংস করা। বিশাল সৈন্যবাহিনী ও সাঁজোয়া যানে সজ্জিত ইসরাইলিদের প্রতিহত করতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি ফিলিস্তিনি গেরিলা গোষ্ঠীগুলো। লেবাননের রাজধানী বৈরুত পর্যন্ত দখলে নেয় ইসরাইল।
এ সময় দেশটির ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ মারা যায়, যাদের বেশিরভাগই ছিলো বেসামরিক জনগণ। ১৯৪৮ এবং ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে যেসব ফিলিস্তিনিরা লেবাননে আশ্রয় নেয় তাদের সুরক্ষার শর্তে আক্রমণের প্রায় তিন মাস পর পিএলও লেবানন ত্যাগ করে তিউনিসিয়ায় চলে যায়।

পিএলও লেবানন ছেড়ে যাবার দুই সপ্তাহ পর, সাবরা ও শাতিলা নামের দুইটি শরণার্থী শিবির ঘেরাও করে গণহত্যা চালায় ডানপন্থী লেবানিজ মিলিশিয়া গোষ্ঠী ‘ফালাঞ্জ’। ইসরাইলি সেনাদের উপস্থিতিতেই এ ঘটনা ঘটে। এতে সাড়ে তিন হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। অনেক ফিলিস্তিনি লেবানন ছেড়ে চলে যায়।
লেবাননে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন এই গণহত্যার সঙ্গে ইসরাইলের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যারিয়েল শেরনের ‘ব্যক্তিগত দায়ের’ কথা জানানো হয় ঘটনার অনুসন্ধানে ইসরাইল সরকারের গঠিত কাহান কমিশনের দেয়া প্রতিবেদনে। সেখান থেকে ধর্মীয়ভাবে চরম বিভক্ত লেবানন গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
ইসরাইল লেবাননের মধ্যকার গৃহযুদ্ধের সুযোগ নেবার চেষ্টা করে। লেবাননে গৃহযুদ্ধ শুরু হবার পর ১৯৭৮ সালে লেবাননে প্রথম হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরাইলি হামলার উদ্দেশ্যই ছিলো দক্ষিণ লেবানন থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠী উৎখাত করে লেবাননের ভেতরে ৬ মাইল এলাকায় ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ তৈরি করা।
অভিযানের ফলে হাজারেরও বেশি লেবানিজ ও ফিলিস্তিনি বেসামরিক লোক মারা যায় এবং কয়েক লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। লেবাননে গৃহযুদ্ধ চলার সময়ে দেশটিতে শিয়াদের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ’র উত্থান হয়। গৃহযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব হবার পর দেশটির রেভ্যুলশনারি গার্ডের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠে হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহ আসার পর লেবানন-ইসরাইল সমীকরণ অনেকটাই বদলে যায়। ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে এই গোষ্ঠীটি। তাদের ঘোষিত নীতিই ছিল ইহুদি রাষ্ট্র ধ্বংস। দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি তাড়িয়ে দেয়া।
লেবাননে গৃহযুদ্ধের অবসান এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আনার উদ্দেশ্যে ১৯৮৯ সালে তায়েফ চুক্তি সই হয়। এর ফলে কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। এ সময় সব গোষ্ঠী অস্ত্র ফেরত দিলেও হিজবুল্লাহ তা করেনি। তারপর হিজবুল্লাহ রাজনৈতিকভাবে আত্মপ্রকাশ করলে অস্বস্তিতে পড়ে যায় ইসরাইল।
১৯৯৩ সালে ইসরাইলি বাহিনী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিযবুল্লাহকে টার্গেট করে পুনরায় দক্ষিণ লেবাননে আক্রমণ করে। সাত দিনের এই যুদ্ধে ৫০ জন নিহত এবং ৪০ জন আহত হয়। তবে, হিজবুল্লাহ’র ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ২০০০ সালে দখলকৃত উত্তর লেবানন থেকে পুরোপুরি সরে যেতে বাধ্য হয় ইসরাইল।
একই সঙ্গে প্রথমবার দেশটি থেকে ইসরাইলিদের হঠাতে সক্ষম হওয়ায় লেবাননের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফোর্স হয়ে ওঠে হিজবুল্লাহ। ২০০৬ সালে দুই ইসরাইলি সেনাকে বন্দি করে হিজবুল্লাহ। হিজবুল্লাহকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে পুনরায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে অভিযান চালায় ইসরাইল।
তবে আগেরবারের মতো, এবার আর সুবিধা করতে পারেনি ইসরাইল। হিজবুল্লাহ’র বিপুল প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা। চলমান সংঘাতের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে এক ঐতিহাসিক সমুদ্রসীমা চুক্তিতে সই করে ইসরাইল-লেবানন।

তারপরও বিভিন্ন সময় দুদেশের মধ্যে থেমে থেমে প্রায়ই সীমান্ত এলাকায় লড়াই চলেই। যেটি আবার নতুন করে শুরু হয়েছে গত বছর ৭ অক্টোবর হামাসের বিরুদ্ধে গাজায় অভিযান শুরুর পর। সাম্প্রতিক সময়ে এই হামলা আরও দ্বিগুণ করেছে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনী- হিজবুল্লাহ।
হিজবুল্লাহর সঙ্গে আপোষ চাইছে ইসরাইল!