বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চীনের প্রভাবকে ‘গুরুতর উদ্বেগ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা ইকনোমকি টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এতে ভারত-বাংলাদেশে সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, এর প্রভাবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে।
প্রভাবশালী পত্রিকায় ইকনোমকি টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি ভারতের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে নিবন্ধটি লিখেছেন শ্রিংলা। ভারতের সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদ, মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ ভারতকে হুমকি দিচ্ছে। এই হুমকি পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামসহ এই অঞ্চলে চোখ রাঙাচ্ছে।
শ্রিংলা বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব বৃদ্ধিকে ‘গুরুতর উদ্বেগ’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর প্রভাবে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে বিরূপ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আগামী মাসে বাংলাদেশের প্রধামন্ত্রীর চীন সফরের কথা রয়েছে। টানা চারবার ক্ষমতায় বসার পর এটা হবে কোনো দেশে শেখ হাসিনার দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফর।
বাংলাদেশ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার উল্লেখ করে শ্রিংলা বলেছেন, নিঃসন্দেহে দুই দেশের মধ্যে পরীক্ষিত বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় ঘোষিত উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ওই সফর সংক্ষিপ্ত হলেও দুই দেশের সম্পর্ক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে ঠাঁসা ছিলো।

নিবন্ধনে তিনি লিখেছেন, নরেন্দ্র মোদী তৃতীয় দফায় সরকার গঠনের পর দ্বিপাক্ষিক সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নয়দিল্লি ভ্রমণ আশ্চর্যের কিছু ছিলো না।
শ্রিংলা লিখেছেন, দশ বছরের স্বল্প সময়ে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৪০ বছরের তুলনায় সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেছেন, যার ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এই সময়টিকে ‘সোনালি অধ্যায়’ বলে যে আখ্যা দিয়েছেন তাতেও নতুন করে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারত বাংলাদেশকে দ্রুত বর্ধনশীল সক্ষমতার একটি ‘ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশি’ হিসেবে দেখে।
গত ২১ জুন দুই দিনের দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারত ভ্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে তৃতীয় দফায় সরকার গঠনের পর এটাই ছিলো কোনো বিদেশি সরকারপ্রধানের প্রথম নয়াদিল্লতে রাষ্ট্রীয় সফর। যদিও তার কয়েকদিন আগেই মোদীর শপথ অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নেন।
এই সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে বেশ কিছু সমঝোতা স্মারক সই করে ভারত।
উভয়দেশ শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যত নিশ্চিতকরণে একটি রূপকল্প ঘোষণা’ গ্রহণ করা। পাশাপাশি ‘ডিজিটাল অংশীদারিত্ব’ এবং ‘টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সবুজ অংশীদারিত্ব’ বিষয়ক দুটি সমন্বিত রূপকল্পকে সামনে রেখে কাজ করতে সম্মত হওয়া।
রেল যোগাযোগ, সামুদ্রিক সহযোগিতা ও সুনীল অর্থনীতি, তথ্য-প্রযুক্তিখাতে সহযোগিতা, স্যাটেলাইট ও সামরিক শিক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। রেল যোগাযোগ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন শহরসহ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যাত্রী ও পণ্যবাহী রেলের যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
স্বাস্থ্য ও ওষুধ খাতে সহযোগিতা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সহনশীলতা ও প্রশমন এবং মৎস্যক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য তিনটি সমঝোতা স্মারক নবায়ন।
এছাড়া, এই সফরে দুই দেশের মধ্যে গৃহীত কিছু কার্যক্রমের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেগুলো হলো-
গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন ও বাংলাদেশের তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও পানি সংরক্ষণের প্রকল্পে ভারতের সহায়তার আলোচনা। তবে এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তি না হওয়া তিস্তার পানি ভাগাভাগির কোনো সম্পর্ক নেই।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে ই-ভিসা চালু এবং রংপুরে ভারতের নতুন সহকারী হাই কমিশন প্রতিষ্ঠা করা।
রাজশাহী ও কলকাতার মধ্যে নতুন ট্রেন সার্ভিস; চট্টগ্রাম ও কলকাতার মধ্যে নতুন বাস পরিষেবা চালু এবং গেদে-দর্শনা এবং হলদিবাড়ি-চিলাহাটির মধ্যে দলগাঁও পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রেন পরিষেবা চালু।
অনুদান সহায়তার আওতায় সিরাজগঞ্জে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণ।
ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি।
মুক্তিযোদ্ধা প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসা প্রত্যাশী রোগীদের জন্য খরচ সর্বোচ্চসীমা আট লাখ টাকা করা এবং বাংলাদেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ চালু।

‘ইউপিআই’ এর ব্যবহার শুরু করার উদ্দেশ্যে দুই দেশ, বাংলাদেশে ‘রুপি’ কার্ড এবং ভারতে ‘টাকা-পে’ কার্ড চালু ।
ইকনোমিক টাইমসে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা লিখেছেন, ভারতের কাছে বাংলাদেশ তার ‘প্রতিবেশি প্রথম’ ও ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির একত্রিত হওয়ার জায়গা। একই সঙ্গে অঞ্চলের সবার জন্য নিরাপত্তা নীতি (সাগর নীতি) এবং ‘ইন্দো-প্যাসেফিক’ ভিশনের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রিংলা লিখেছেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ একটি নয়াদিল্লির জন্য অপরিহার্য অংশীদার। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ভারতের সাথে তার সম্পর্ককে ‘প্রধান প্রতিবেশি’, ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ (প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কথায়) এবং একটি প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে মূল্যায়ন করে। এশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার ভারত।
শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুই দেশের সই হওয়া ১০ চুক্তিকে ‘গতিশীল সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়ের ভিত্তি স্থাপন’ হিসেবে আখ্যা দেন শ্রিংলা। এসব সমঝোতাকে দুই পক্ষের ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার, দিকনির্দেশনা, প্রেরণার উপাদান হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।
ঢাকায় নয়দিল্লির এই সাবেক দূত অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বণ্টনের কথা তুলে ধরে বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় তথ্য বিনিময়কে অগ্রাধিকার দিতে এবং যৌথ নদী কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন পানি বণ্টনের কাঠামো প্রণয়নে সম্মত হন। তিস্তা ও গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের আলোচনা এবং এ বিষয়ে চুক্তির কথাও উঠে আসে হর্ষবর্ধনের নিবন্ধে।
নরেন্দ্র মোদীকে উদ্ধৃত করে নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘২০৪৭ সালের বিকশিত ভারত’ এবং বাংলাদেশের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১’ দুই দেশের ভবিষ্যতবাদী দৃষ্টিভঙ্গী বৃদ্ধির পরিবেশ, সম্পর্কে স্থাযীত্ব এবং সুনীল অর্থনীতি পারস্পরিকভাবে ভাগ করে নেওয়ার কথা বলে।
মহাকাশ খাতে দুই দেশের হত মেলানোকে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন কূটনীতিক হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। তিনি লিখেছেন, উভয় দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল ক্ষেত্রে সহযোগিতার উপরও বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করার জন্য, দুই দেশ একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিতে আলোচনা শুরু করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
শ্রিংলার নিবন্ধে, মংলা ও মিরসরাইয়ে ভারতের প্রস্তাবিত দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রাথমিক কার্যক্রম, নতুন সীমান্ত-হাট খোলা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য সুবিধা, সড়ক, রেল, বিমান ও সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং বাণিজ্য অবকাঠামোর উন্নতি নিয়ে আলোচনার ফলাফল নিয়েও লেখা হয়েছে। তিনি লিখেছেন এসব সহযোগিতা দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্যকে জনগণের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করার পদক্ষেপ।
নিবন্ধে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা লিখেছেন, কানেক্টিভিটি ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতার মূল ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী মোদি উল্লেখ করেছেন, দুটি দেশ ১৯৬৫ এর আগের সমস্ত সংযোগ পুনরুদ্ধার করেছে এবং মানুষ, পণ্য ও পরিষেবার বিরামহীন আন্তঃসীমান্ত চলাচলের জন্য আরও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করে, দুই দেশ বাংলাদেশি সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণের জন্য প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা খুঁজবে। যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতার উন্নয়নও করা হবে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের উন্নয়নের বৃহত্তম অংশীদার। দুই দেশ এখন উন্নয়ন অংশীদারিত্বের জন্য একটি নতুন ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিতে কাজ করছে যা ‘আমাদের প্রকল্প এবং কর্মসূচির নাগালকে প্রসারিত করবে…এবং ঘনিষ্ঠ সংযোগের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করবে’।
হর্ষবর্ধন শ্রিংলা লিখেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল রয়েছে। তবে, উভয় পক্ষকে সম্ভাব্য ‘বিপদ’ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদ, মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ ভারতকে হুমকি দিচ্ছে। এই হুমকি পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামসহ এই অঞ্চলে তার চোখ রাঙাচ্ছে।
শ্রিংলা বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব বৃদ্ধিকে ‘গুরুতর উদ্বেগ’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন এর প্রভা ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে বিরূপ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার উল্লেখ করে শ্রিংলা বলেছেন, নিঃসন্দেহে দুই দেশের মধ্যে পরীক্ষিত বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় ঘোষিত উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।
ভারত-বাংলাদেশ ‘সৌহার্দ্য’ আরও বাড়বে